রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৩

১৫ নভেম্বর শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ : হাটহাজারীতে লক্ষাধিক তৌহিদি জনতার সমাবেশে আল্লামা শফীর ঘোষণা

 

আগামী ১৫ নভেম্বর ফের রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পার্বতীপুর হাইস্কুল মাঠে হেফাজতের বিভাগীয় মহাসমাবেশ থেকে ১৫ নভেম্বরের এ মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। এতে বাধা দিলে পরে হরতালের মতো কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও হাটহাজারীর মহাসমাবেশ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়। একই সঙ্গে শাপলা চত্বরের ১৫ নভেম্বর এ মহাসমাবেশের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ৭ নভেম্বর সিলেট, ৮ নভেম্বর খুলনায় মহাসমাবেশ করার পাশাপাশি সারাদেশে জেলা পর্যায়ে সমাবেশ করার ঘোষণা দেন হেফাজত নেতারা।
মহাসমাবেশে অবিলম্বে শাপলা চত্বরের গণহত্যার বিচার, রাসুলের বিরুদ্ধে কটূক্তিকারী ব্লগার ও নাস্তিকদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দাবি জানানো হয়। অন্যথায় এদেশের সর্বস্তরের মুসলিম তৌহিদি জনতা তাদের ঈমানি শক্তি দিয়ে ওইসব নাস্তিক-মুরতাদদের কঠোরহস্তে প্রতিহত করবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
গতকালে হাটহাজারীর এ মহাবেশে লাখো আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতার ঢল নামে। এতে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন দেশ শীর্ষ আলেম ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। মহাসমাবেশ থেকে আগামী ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়।
এতে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ইসলাম ও সত্য কথা লেখার কারণে আটক রাখা হয়েছে দাবি করে অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করেন হেফাজতের নেতারা। অন্যথায় বন্ধ মিডিয়া খুলে দিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কঠোর কর্মসূচি দেবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
প্রসঙ্গত মতিঝিলের শাপলা চত্বরেই ব্লগে আল্লাহ, রাসুল (স.) ও পবিত্র কোরআন নিয়ে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় কটূক্তির দায়ে নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা দাবিতে গত ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ ও পরে ৫ মে ঢাকা অবরোধের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকালের বিশাল জনসমাগম ঘটিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি। তবে ৫ মে’র সমাবেশ লাখ লাখ আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতার ওপর রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খল বাহিনী বর্বর গণহত্যা চালালে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এ গণহত্যার পর হেফাজতে ইসলাম ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও গত ছয় মাসে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে। তবে ১৫ নভেম্বর আবারও শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়ে নতুন করে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রকাশের ঘোষণা দিল হেফাজত।
গতকাল হাটহাজারীর মহাসমাবেশ থেকে হেফাজতের নেতারা হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে শাপলা চত্বর থেকে আলেম-ওলামাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। সেই শাপলা চত্বরেই আবার তারা জমায়েত হবেন। এই সমাবেশে বাধা দিলে সরকারকে এর কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আইন পাস থেকে সরকারকে বিরত থাকা, উলামা-মাশায়েখ ও কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা ও কটূক্তি বন্ধ, সংসদ বহাল থাকতেই সংবিধান সংশোধন করে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর কটূক্তিকারীদের ফাঁসির আইন পাস, ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের হয়রানি, মিথ্যা মামলা ও দমন-পীড়ন বন্ধ করাসহ ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল হাটহাজারীতে ওই মহাসমাবেশ করা হয়।
গতকালের মহাসমাবেশে হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, হেফাজতের ১৩ দফা বাস্তবায়ন হলে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। দেশ বর্তমানের চেয়ে অনেক ভালো চলবে। আমাদের ১৩ দফায় কোনো মারামারি, হানাহানি, মিথ্যাচার, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী নেই। ওলামায়ে কেরাম সবসময় দুর্নীতি, মিথ্যাচার, সন্ত্রাস, হানাহানি ও জোর-জুলুমের বিরুদ্ধে। ১৩ দফা বাস্তবায়ন হলে দেশের শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার পাবে। গামেন্টকর্মীরা তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন-ভাতাসহ তাদের সব অধিকার ফিরে পাবে।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে সরকারের কিছু মন্ত্রী, এমপি ও কর্তাব্যক্তিরা মিথ্যাচার ও কটূক্তি করে যাচ্ছেন। আমি যা বলেছি, তা ঠিকমত প্রকাশ না করে তারা মিথ্যা ও কারসাজির আশ্রয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আমি মহিলাদের ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছি। রানীর সঙ্গে তুলনা করেছি। তারা মায়ের জাত। ওলামায়ে কেরাম সবসময় নারী জাতির সম্মান, ইজ্জত ও নিরাপত্তার কথা বলে থাকেন। ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে, কোনো ধর্ম সে সম্মান দেয়নি।
হেফাজতের আমির বলেন, আমাদের ঈমানি আন্দোলনে শাপলা চত্বরসহ সারাদেশে যারা শহীদ হয়েছেন, জুলুম-অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন তাদের আল্লাহ কবুল করুন।
তিনি একই সঙ্গে বলেন, ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে দেড় লাখ গুলি খরচ হয়েছে। কতজন আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ নবীপ্রেমিকদের হত্যা করেছেন, তার হিসাব সরকারের কাছে আছে। আমি এ হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি জানাচ্ছি।
আল্লামা শাহ আহমদ শফী সরকারের সাম্প্রতিক কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন পাসের উদ্যোগের প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের শর্ত মেনে যদি সনদ দেয়া হয়, তবে কোনো বাধা নেই। কিন্তু সনদের কোনো উল্লেখ না করে সরকার কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এবং দেশ থেকে ইসলামী শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য আইন পাস করতে চাচ্ছে। ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতা এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ও বিধ্বংসী আইন পাস করতে দেবে না।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, ফতেয়াবাদ, রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুণ্ড, মিরেরসরাই, রাঙামাটি, রামগড়, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লক্ষাধিক ইসলামপ্রিয় তৌহিদি জনতা, সাধারণ মানুষ, আলেম-ওলামা এ মহাসমাবেশে যোগ দেয়।
এ সময় জনস্রোতে পরিণত হাটহাজারী এলাকা। ওলামা-মাশায়েখ, কওমি মাদরাসা ও তৌহিদি জনতার বিরুদ্ধে মহাজোট সরকারের ষড়যন্ত্র ও ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক মুরতাদ ব্লগারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাস ও ফাঁসির দাবিতে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে মহাসমাবেশ এলাকা।
একই সঙ্গে তৌহিদি জনতা সরকারের ইসলাম ও দেশবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ, দুর্নীতি ও জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। এ সময় মিছিলকারীদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছিল।
নানুপুর জামিয়া ওবাইদিয়ার পরিচালক আল্লামা সালাহউদ্দীন নানুপুরীর সভাপতিত্বে এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহাসমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা মির ইদরীস, এম আহসান উল্লাহ ও মাহমুদ হোসাইনের পরিচালনায় মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলামের আমির শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।
প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মজলুম জননেতা আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী। মহাসমাবেশে সংহতি জানিয়ে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চৌধুরী।
এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক আল্লামা মুফতি নূর হোসাইন কাসেমী, প্রবীণ মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ শামসুল আলম, আল্লামা আবদুল হামিদ পীরসাহেব মধুপুর, আল্লামা তাজুল ইসলাম, মাওলানা মাহফুজুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা লোকমান হাকিম, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা সলিম উল্লাহ নাজিরহাট, মাওলানা মুঈনুদ্দিন রুহী, মাওলানা ইসহাক রাঙ্গুনিয়া, মাওলানা ফোরকান আহমদ, মুফতি জসিম উদ্দিন, মাওলানা আহমদ দিদার, মাওলানা আনাস মাদানি, মাওলানা মুনির আহমদ, মাওলানা হাবিবুল্লাহ আজাদী, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন ঢাকা, মাওলানা আলতাফ হোসাইন, মাওলানা আবদুর রব ইউসুফি, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদি, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা মুফতি আবদুল আজিজ, মাওলানা হাবিবুর রহমান কাসেমী, মাওলানা হাফেজ ফয়সল, মাওলানা আজিজুর রহমান বাবুনগর, মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ আলী, মাওলানা মুহিউদ্দিন একরাম, মাওলানা ইবরাহিম শিকদার, মাওলানা শফিউল আলম, মাওলানা আবদুল্লাহ চারিয়া, মাওলানা ওসমান চারিয়া, মাওলানা জাহাঙ্গীর মেহেদী, মাওলানা জাকারিয়া নোমান, মাওলানা আলমগীর প্রমুখ।
প্রধান বক্তা আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, আমরা আগেও বলেছি, ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে ঈমান-আকিদার বিপক্ষে, ইসলামের বিপক্ষে এবং নাস্তিক ব্লগারসহ ধর্মদ্রোহীদের পক্ষে এভাবে অবস্থান নিয়ে কেউ ক্ষমতায় যেমন টিকে থাকতে পারবে না, তেমনি কেউ ক্ষমতায় যেতেও পারবে না। এদেশের ধর্মপ্রাণ তৌহিদি জনতা, আলেম-ওলামা এখন দল-মত ও ছোটখাট মতভেদ ভুলে গিয়ে ১৩ দফা ঈমানি দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। মুসলমানদের ঈমানি দৌলত ও হিম্মতের কাছে ষড়যন্ত্র করে কোনো শক্তিই টিকে থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, আমি আবারও পরিষ্কার বলতে চাই—হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি এদেশের অধিকাংশ মানুষের দাবি। এ দাবি গণদাবি। জনগণের দাবিকে উপেক্ষা করার পরিণাম শুভ হবে না। যারা নাস্তিক ব্লগার, রাসুল (সা.)-কে কটূক্তিকারী ধর্মদ্রোহীদের পক্ষ নিচ্ছেন, তাদেরকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশের চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করছি।
তিনি রাসুল (সা.)-কে কটূক্তিকারী নাস্তিক ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের গ্রেফতার করে শাস্তি প্রদান, ধর্ম অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে আইন পাস, সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থার নীতি ফিরিয়ে আনাসহ ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় জনগণ আপনাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
হেফাজত মহাসচিব আলেম-ওলামাদের ওপর হয়রানি বন্ধ, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং মুফতি ওয়াক্কাস, মুফতি সাখাওয়াত, মুফতি হারুনসহ গ্রেফতার করা আলেম-ওলামাদের মুক্তির দাবি জানান।
মহাসচিব আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ইসলাম ও সত্য কথা তার পত্রিকায় লেখার কারণে এই সরকার তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করে রেখেছে।
তিনি অবিলম্বে মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবি করে বলেন, বাংলাদেশের লাখ মানুষের প্রাণপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক আমার দেশ-এর বন্ধ প্রেস খুলে দিতে হবে, অন্যথায় বন্ধ মিডিয়া খুলে দিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কঠোর কর্মসূচি দেবে।
সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতারা কওমি মাদরাসা শিক্ষার স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধ্বংস ও ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারের অযাচিত নিয়ন্ত্রণ আরোপের নীল নকশা, অবিলম্বে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুত্সা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস, ইসলাম অবমাননাকারী ব্লগারদের ফাঁসি ৫, মে শাপলা চত্বরের গণহত্যা ও পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনার বিচার, সরকারের ইসলামবিরোধী বিভিন্ন নীতি বাতিল এবং উলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন বন্ধের দাবি জানিয়ে বক্তৃতা করেন।
বক্তারা বলেন, তৌহিদি জনতার একটাই দাবি, শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের এই বাংলাদেশে ইহুদিদের এজেন্ট নাস্তিক-মুরতাদদের যেমন বেঁচে থাকার অধিকার নেই, তেমনি নাস্তিক্যবাদের সহায়ক ও দোসরদের ক্ষমতায় থাকারও কোনো সুযোগ নেই। এদেশের মুসলমানদের শরীরে এক ফোঁটা রক্ত থাকতেও ইসলাম ও নবীকে (সা.) নিয়ে জঘন্যতম কটূক্তিকারী ও ইসলামবিরোধী ধর্মহীন নাস্তিক সরকারকে বরদাস্ত করবে না, বরদাশত করা যায় না।
সমাবেশে বক্তারা শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা ও পীর আউলিয়ার এ দেশে আলেম-উলামা, ইসলামী শিক্ষা, মসজিদ-মাদরাসার বিরুদ্ধে অবস্থান, নবী (সা.) সম্পর্কে কটাক্ষ এবং ইসলামকে নির্মূলের যে কোনো ষড়যন্ত্র জীবন দিয়ে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ইসলামের মর্মবাণী না বুঝে ইহুদি-নাসারাদের এজেন্টের মতো তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদসহ ক্ষমতাসীন সরকারের কিছু মন্ত্রী-এমপি লাগামহীনভাবে উলামা-মাশায়েখ, কওমি মাদরাসা ও ইসলামবিরোধী বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে আঘাত হানছেন।
তারা বলেন, আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সরকারকে জানিয়ে দিতে চাই, ইসলাম ও রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বন্ধ, শাপলা চত্বরের গণহত্যায় দায়ী এবং ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক চক্রের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হওয়া ছাড়া ফুঁসে ওঠা উলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদি জনতা ঘরে ফিরবে না। সুতরাং অবিলম্বে সরকারকে তার ইসলামবিরোধী নীতি বদল করে হেফাজতের ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নসহ আমাদের সব দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে, অন্যথায় ইসলামের দুশমন এই জালিম সরকারের পতনসহ আগামী নির্বাচনে কোটি কোটি তৌহিদি মানুষ সমুচিত জবাব দেবে।
হেফাজতে ইসলমের নায়েবে আমির আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, বর্তমান সরকার পবিত্র ইসলাম ও ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই সরকার নাস্তিক-মুরতাদদের মদতদাতা, নাস্তিকদের পক্ষ অবলম্বন করে সরকার একের পর এক ইসলামবিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সরকার নাস্তিক্যবাদের মদতদাতা হিসেবে জাতির কাছে চিহ্নিত হয়ে পড়েছে।
যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ধর্ম কারও সম্পত্তি নয়। দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা নতুন করে চালু হওয়ার পর থেকেই ইসলামবিরোধীদের আস্ফাালন লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আড়ালে সারাদেশে অনাচার-ব্যাভিচার ছড়িয়ে দেয়ার অপতত্পরতা চলছে।
তিনি সরলমনা জনসাধারণ প্রথমে বুঝতে না পারলেও এখন পরিষ্কার বুঝে গেছে যে, ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিকরা সরকারের ছত্রছায়ায় তরুণ সমাজের আবেগকে বিভ্রান্ত করে এক জঘন্য ইসলামবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
তিনি তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত না হয়ে নাস্তিক-মুরতাদ ও তাদের সহায়তাকারীদের প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারকে অবিলম্বে রাসুলের অবমাননাকারীদের কঠোর শাস্তিসহ সব ইসলামবিরোধী অপতত্রতা বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় ইসলামী নেতারা তৌহিদি জনতাকে সঙ্গে নিয়ে এর প্রতিরোধে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।
সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির আচরণ ও বক্তব্যে মনে হচ্ছে, মহাজোট সরকার সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সরকার ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে প্রমাণ করেছে এই সরকার তৌহিদি জনতা ও ইসলামবিরোধী। তাই বর্তমান ইসলামবিরোধী সরকার ও কুলাঙ্গার নাস্তিকদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।
তিনি বলেন, আমরা শুনতে পাচ্ছি, দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী ক্যাডাররা মসজিদের খতিবদের নাস্তিকদের বিরুদ্ধে কথা না বলার জন্য হুমকি দিচ্ছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের এদেশে এই ধরনের হুমকি বরদাশত করা হবে না। বাংলাদেশে ইসলামের এ দুঃসময়ে যদি মুসলমানরা বসে থাকে, তবে এই মুরতাদ সরকারের হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করা যাবে না।
মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ কোরবানির জন্য সর্বস্তরের তৌহিদি জনতাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। পবিত্র হাদিস শরীফে আছে, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নবীজীর প্রতি মহব্বত নিজের, পরিবার-পরিজনের, ছেলে-সন্তানদের মহব্বতের চেয়ে অধিক হবে।’ অথচ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে সেক্যুলার বর্তমান মহাজোট সরকারের ছত্রছায়ায় নাস্তিক, মুরতাদ ও গোমরাহ ব্লগাররা সরাসরি মহান আল্লাহ তায়ালা, প্রিয় নবীজী, ইসলামী বিধিবিধান নিয়ে নির্লজ্জভাবে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেয়ার দুঃসাহস দেখানোর সাহস পাচ্ছে। এই মহাসমাবেশ থেকে সরকারকে জানিয়ে দিতে চাই, অবিলম্বে শাপলা চত্বরের গণহত্যার বিচার, রাসুলের বিরুদ্ধে কটূক্তি করা ব্লগার ও নাস্তিকদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দিতে হবে; অন্যথায় এদেশের সর্বস্তরের মুসলিম তৌহিদি জনতা তাদের ঈমানি শক্তি দিয়ে ওই নাস্তিক-মুরতাদদের কঠোর হস্তে প্রতিহত করবে।
মাওলানা মীর ইদরীস বলেন, ধর্মহীন শিক্ষানীতি প্রণীত হওয়ার ফলে নতুন প্রজন্ম ইসলামের ভাবাদর্শ থেকে ছিটকে পড়ে নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনের দিকে দ্রুত ধাবিত হয়ে পড়ছে। যার কুফল এরই মধ্যে আমরা অবলোকন করতে শুরু করেছি। দাড়ি-টুপিধারী ও ইসলামপন্থীদের ওপর আক্রমণ এবং আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে ইসলামবিরোধী মনোভাব তৈরি হওয়া ছাড়াও দেশব্যাপী সুদ-ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি, ধর্ষণ-ব্যাভিচার বিরামহীনভাবে বেড়ে গিয়ে আদর্শ ও নৈতিকতার ধস নামতে শুরু করেছে।
মহাসমাবেশে হেফজাতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব কর্মসূচি ঘোষণা করন। এতে তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলাম ৭ নভেম্বর সিলেট ও ৮ নভেম্বর খুলনায় মহাসমাবেশ, ১৫ নভেম্বরের আগে সারাদেশে জেলা পর্যায়ে সমাবেশ, ১৫ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ এবং ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে মহাসমাবেশ করবে।

রবিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৩

পহেলা নভেম্বর মাঠে নামছে হেফাজত : কওমি মাদরাসা সরকারি নিয়ন্ত্রণে আইন পাস হলে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে : আল্লামা শফী

 
হেফাজতের আমির ও কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমেদ শফী দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তত্পরতা থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি গতকাল চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আলেমদের কথা না শুনে একগুঁয়েমি করে সরকার কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩ পাস করলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। আল্লামা শফী আরও বলেন, কওমি মাদরাসাগুলো যদি সরকারি নিয়ন্ত্রণে যায়, তবে দেশে ধর্মীয় শিক্ষা থাকবে না। এ জন্য সরকারকে বারবার বলছি, এ মাদরাসাগুলো পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে চালিয়ে আসছি সেভাবে রাখার জন্য।
এদিকে কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩ পাস থেকে সরকারের বিরত থাকা ও ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গতকালের সংবাদসম্মেলনে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামবাদী।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১ নভেম্বর সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ, ২ নভেম্বর চট্টগ্রাম হাটহাজারী কলেজ ময়দানে মহাসমাবেশ এবং ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সব বিভাগীয় শহরে ধারাবাহিকভাবে মহাসমাবেশ। এদিকে হেফাজত নেতারা সরকারকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, এসব কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হলে হরতালসহ কঠিন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
হাটহাজারী ডাকবাংলোয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে আজিজুল হক ইসলামবাদী সরকার এই আইনের মাধ্যমে নিজেদের মনোনীত কিছু লোককে চাপিয়ে দিয়ে বস্তুত কওমি মাদরাসাগুলো ওপর খবরদারি করতে চায়। সনদের তথাকথিত স্বীকৃতির নাম দিয়ে আলিমদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টিরও গভীর চক্রান্ত করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, আলিম-ওলামাকে ইমান-আকিদার প্রশ্নে যে কোনো আন্দোলন থেকে বিরত রেখে আত্মরক্ষামূলক ভূমিকায় ঠেলে দেয়ার জন্য এটি সরকারের আরেকটি নতুন চাল। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলিম, কওমি মাদরাসা বোর্ডের দায়িত্বশীল ও বিভিন্ন মাদরাসার প্রিন্সিপালরা সরকারের এই হঠাকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও অতি উত্সাহী কিছু মিডিয়া কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া একের পর এক মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসূত সংবাদ পরিবেশন করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। লালখান বাজার মাদরাসায় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনাকে ঘিরে হাটহাজারী মাদরাসাসহ সারা দেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে জঙ্গি ও বোমাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রমাণ করার জন্য ভয়াবহ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, বাংলাদেশের কোনো কওমি মাদরাসায় কোনো ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই। এসব মাদরাসায় সত্, আদর্শবান ও খোদাভীরু আলিম তৈরি হয়, যারা সারা জীবন সমাজ, সমাজের মানুষ ও মানবতার সেবায় নিজেদের জীবন উত্সর্গ করে যায়। দেশের আইনবিরোধী অনৈতিক কাজে তারা কখনও সম্পৃক্ত হয়নি।
দেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে বহু দিন থেকে নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বিধৃত মাদরাসা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে সরকার ১৫ এপ্রিল ২০১২ সালে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন নামে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির, কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) চেয়ারম্যান, উপমহাদেশের বিখ্যাত কওমি মাদরাসা দারুল উলুম হাটহাজারীর মুহতামিম, আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে। সরকারের ছলচাতুরী বুঝতে পেরে আল্লামা শাহ আহমদ শফীসহ দেশের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম এই কমিশন প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু সরকার তার আজ্ঞাবহ মাওলানা ফরিদুদ্দিন মাসউদ ও মাওলানা রুহুল আমিনের মাধ্যমে কওমি মাদরাসা ও ওলামায়ে কেরামদের সরকারের পক্ষে আনতে ব্যর্থ হয়ে কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৩-এর খসড়া তৈরি করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে যে, গত ৮ অক্টোবর একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা হয়। এরপর অতি দ্রুত, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত নেয়া হয়। গত ২০ অক্টোবর সকালে তা প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। এখন শুধু মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হলেই তা অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে।
আমরা মনে করি, সরকারের ঘাড়ে চেপে-বসা ইসলামবিদ্বেষী একটি চক্রের প্ররোচনায় নানা ছলছুতোয় কওমি মাদরাসাগুলো কব্জা করার অশুভ পথে পা বাড়াতে উদ্যত হয়েছে সরকার। কেননা একদিকে তারা কওমি মাদরাসার দরদি সেজে তাদের মতো করে কওমি সনদের স্বীকৃতির প্রলোভন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সব কওমি মাদরাসা, আলিমসমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষের অবিসংবাদিত আধ্যাত্মিক নেতা, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আমরা সরকারকে আবারও সতর্ক করতে চাই—কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আইনের নামে হাজার হাজার কওমি মাদরাসার ওপর ছড়ি ঘোরানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসুন। নইলে সারা দেশের আলিম সমাজ ও মাদরাসা-শিক্ষকরা সর্বস্তরের মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের এই অশুভ পদক্ষেপ রুখে দাঁড়াবে। গড়ে তুলবে দুর্বার গণআন্দোলন। কওমি মাদরাসার অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা রক্ষার প্রয়োজনে কঠিনতর কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে।
বিগত ২৫ সেপ্টেম্বর আমরা সারা দেশে স্মারকলিপি দিয়ে সরকারকে কওমি মাদরাসার স্বার্থবিরোধী এই আইন বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপিত আমাদের দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে সরকার তার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথেই অগ্রসর হচ্ছে। আমরা মনে করি এ পথ থেকে সরে না এলে সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হবে।
আজিজুল হক ইসলামবাদী বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, দেশে হাজার হাজার কওমি মাদরাসার লাখ লাখ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও তাওহিদি জনতা এই আইন কখনো বাস্তবায়ন হতে দেবে না ইনশাআল্লাহ।
বিগত ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিদ্যুিবচ্ছিন্ন করে, রাতের অন্ধাকারে নবীপ্রেমিক জনতার ওপর যৌথবাহিনী দিয়ে এক লাখ পঞ্চান্ন হাজার রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছে। লাখ লাখ নিরীহ মুসলমানদের ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। এ ঘটনা অসংখ্য ওলামা-পীর-মাশায়েখকে শহীদ করা হয়েছে। বহু মানুষ চিরদিনের জন্য পঙ্গু ও অন্ধ হয়ে গেছেন। আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে সরকারদলীয় ক্যাডার, নাস্তিক-মুরতাদদের দোসররা নৃশংস হামলা চালালো অথচ উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে সারা দেশে অর্ধশতাধিক মামলা হয়রানি করা হচ্ছে।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা সেদিন পবিত্র কোরআন পুড়িয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ওপর দায় চাপানোর অপচেষ্টা করা হয়, যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এই সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় দায়িত্বশীল হেফাজতের বিরুদ্ধে প্রতিদিন অব্যাহত মিথ্যাচার করে চলেছেন। আমীরে হেফাজত, শায়খুল ইসলাম, আলামা শাহ্ আহমদ শফীর বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদসহ সর্বত্র কুত্সা রটিয়ে আলিমসমাজকে জাতির সামনে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের প্রখ্যাত আলিম, সাবেক মন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস ও মুফতি হারুন ইজহারসহ অসংখ্য আলিম-ওলামা, মাদরাসা ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ তাওহিদি জনতাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অবিলম্বে গ্রেফতারদের নিঃশর্তমুক্তি এবং দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
সংবাদসম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী, নায়েবে আমির মাওলানা শামশুল আলম, কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, নায়েবে আমির হাফেজ তাজুল ইসলাম, মাওলানা লোকমান, যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা মঈনুদ্দী রুহী, মাওলানা সেলিম উল্লাহ, হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতের আমির মাওলানা মাহমুদুল হাসান, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা হাবিবুল্লাহ আজাদী, নির্বাহী সদস্য মাওলানা মুফতি হাবিবুল রহমান কাসেমী, উত্তর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস, চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা মোজাম্মেল হক, নির্বাহী সদস্যে মাওলানা আবদুল্লাহ, হেফাজতে ইসলাম হাটহাজারী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জাকিরিয়া নোমান, সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা সফিউল্লাহ, আহসান উল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গির মেহেদী, মহানগর নেতা মাওলানা ফয়সল তাজ, মাওলানা ইব্রাহিম সিকদার, মাওলানা আনাস আহমেদ উল্লাহ প্রমুখ। Daily Amerdesh

নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই

নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই

দুই নেত্রীর ফোনালাপ




রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত ফোনালাপ হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ফোন করে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে আগামীকাল গণভবনে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে হরতাল প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানান। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এ আমন্ত্রণকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে বলেন, হরতাল কর্মসূচির কারণে ওইদিন তিনি গণভবনে যেতে পারছেন না। তবে ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যার পর হরতাল শেষে যে কোনো সময় আলোচনার জন্য ডাকলে তিনি সাড়া দেবেন। হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান সম্পর্কে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে ফোনে জানান, হরতাল কর্মসূচি ১৮ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত। জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করে তার পক্ষে এ মুহূর্তে হরতাল প্রত্যাহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, প্রধনমন্ত্রীর এই ফোন এক দিন আগে পেলেও জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া যেত।
প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে ৩৭ মিনিট ধরে এই ফোনালাপ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিটে এই ফোন করেন। এই ফোনালাপ সম্পর্কে দু’পক্ষই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ প্রেস ব্রিফিং করে বলেন, আজকের দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে ফোনালাপ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ফ্রিফিংয়ে বলেন, দুই নেত্রীর মধ্যে এই ফোনালাপ একটি শুভ সূচনা।
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আলোচনার জন্য তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন।
সৈয়দ আশরাফ জানালেন, যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত প্রধানমন্ত্রী, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেননি খালেদা জিয়া
বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন করার বিষয়টি জানিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় গণভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন,আজকের (গতকাল) দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ (গতকাল) বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন করার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ উদ্যোগে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়াকে ফোন করেছেন। ফোনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। বিরোধী দলের নেতা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেননি।
আশরাফ বলেন, তাদের মধ্যে ৩৭ মিনিট কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাকে গণভবনের আসা ও নৈশভোজের জন্য দাওয়াত দিয়েছেন। বিরোধী দলের নেতা তাকে জানিয়েছেন, জোটের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
আওয়ামী লীগের এই মুখপাত্র বলেন, আমাদের জানা মতে, তাদের মধ্যে নেতিবাচক কথা হয়নি। আমরা বিশ্বাস করি, বিরোধী দলের নেতা আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন, ২৮ তারিখ গণভবনে আসবেন। সেখানেই আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে। আশা করি এখন আর হরতালের প্রয়োজন নেই। যেখানে আলোচনা আছে, সেখানে হরতালের প্রয়োজন নেই।
বিরোধী দলের সঙ্গে যে কোনো ইস্যুতে আওয়ামী লীগ আলোচনায় রাজি আছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যে কোনো বিষয়ে আলোচনার দুয়ার খোলা আছে। জাতি আশা করেছিল, দুই নেত্রী কথা বলবেন এবং সঙ্কটের নিরসন হবে।
আলোচনা হলে তার বিষয়বস্তু কী হবে জানতে চাইলে আশরাফ বলেন, আলোচনা শুরু হবে। দুই নেত্রী আলোচনা শুরু করবেন। আমরা থাকতেও (আলোচনায়) পারি, নাও পারি। তারা ঠিক করবেন, তাদের সূচনা আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বিএনপি, না ১৮ দলের জোটকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ‘ওয়ান টু ওয়ান’ আলোচনা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধী দলের নেতা যতজন নিয়ে আসতে চান, আসতে পারেন। তিনি কতজন নিয়ে আসবেন, প্রধানমন্ত্রী তা আগে জানাতে বলেছেন।

দুঃখ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তবে আশাবাদী
টেলিফোন করে হরতাল প্রত্যাহার ও সংলাপের আমন্ত্রণ জানানোর পরও হরতাল প্রত্যাহার না করা ও হরতাল কর্মসূচি শেষে সংলাপে আসার বিএনপির সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুঃখ পেয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি বলেন, তাদের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দুঃখ পেয়েছেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইকবাল সোবহান বলেন, বিএনপির এমন সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা তাদের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছি। তাহলে কেন তারা হরতাল প্রত্যাহার করে সংলাপে আসবেন না?
সংলাপের প্রস্তাব পাওয়ার পর হরতাল প্রত্যাহার না করে বিরোধীদলীয় নেতা স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন। তারপরও তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা নৈশভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন, হরতাল প্রত্যাহার করবেন।

টেলিসংলাপে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একাংশ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল দুপুরে রেড টেলিফোনে বারবার ফোন করে বিরোধীদলীয় নেতাকে পাননি বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, খালেদা জিয়ার বাড়ির টেলিফোনটি বিকল হয়ে আছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর এডিসি মোবাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন। সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ওই এডিসির মোবাইল ফোনেই খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম। আমি রেড টেলিফোন থেকে নিজের হাতে ফোন করেছি। বারবার রিং হয়েছে। আমি দুঃখিত যে আপনি ধরতে পারেননি। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা রেড টেলিফোন দীর্ঘদিন ধরে ডেড থাকার কথা জানালে প্রধানমন্ত্রী এজন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, (টেলিফোন) ডেড, নাকি ডেড করে রাখা হয়েছে, বলতে পারছি না। আগামীকাল (আজ) আমি দেখব।
টেলিফোনে বিরোধীদলীয় নেতাকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী, ২৮ তারিখ (আগামীকাল) রাতে খাওয়ার জন্য আপনাকে দাওয়াত করছি। যতজন খুশি নিয়ে আসতে পারেন। আমি আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি আগামী নির্বাচন সম্পর্কে গণভবনে আসার জন্য।
নির্বাচনের আগে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আমি এরই মধ্যে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছি, তা আপনি জানেন।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা তাদের হরতালের প্রসঙ্গ তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি হরতাল প্রত্যাহার করে নেন। দেশ ও জনগণের স্বার্থে হরতাল প্রত্যাহার করেন।
কথা বলার সময় শেখ হাসিনার ডান দিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, বাম দিকে তোফায়েল আহমেদ, এইচটি ইমাম বসা ছিলেন। এছাড়া অন্যদের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান ছিলেন।
খালেদা জিয়া বললেন, এখন আর হরতাল প্রত্যাহার সম্ভব নয় নীতিগতভাবে দাবি মেনে নিলে কর্মসূচি স্থগিত
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার ফোনালাপে হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বানের পর বিএনপি জানিয়েছে, হরতাল বহাল থাকবে। নির্দলীয় সরকারের ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হরতাল কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনা শুরুর আহ্বান জানালে বিএনপি তাতে সাড়া দেবে। যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিতে প্রস্তুত বিরোধীদলীয় নেতা।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার ৩৭ মিনিট টেলিফোন সংলাপের পর তার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
বিরোধীদলীয় নেতার বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের মোবাইল টেলিফোনে গণভবন থেকে কল এলে তা বিরোধীদলীয় নেতাকে দেয়া হয়। ওই কলটি ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করে সোমবার সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা প্র্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছেন, তিনি যদি নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হবে—এ বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হন, তাহলে ঘোষিত হরতাল কর্মসূচি আমি স্থগিত করব।
প্রধানমন্ত্রীর হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়ার অনুরোধ সম্পর্কে প্রেস সচিব বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, হরতালের কর্মসূচি ১৮ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত। জোট নেতারা পুলিশে তাড়া খেয়ে বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাদের একত্রিত করে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা এও বলেন, আপনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি এই টেলিফোনটি গতকাল (শুক্রবার) করতেন, তাহলে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। এখন আমার একার পক্ষে হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে ১৮ দলীয় জোট সারাদেশে আজ রোববার ভোর ৬টা থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লাগাতার ৬০ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গত শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় খালেদা জিয়া এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
মারুফ কামাল খান জানান, গুলশানে নিজ বাসভবনে অবস্থানরত বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে প্রায় ৩৭ মিনিট কথা হয় প্রধানমন্ত্রীর।
২৮ অক্টোবর গণভবনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ সম্পর্কে প্রেস সচিব বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ্ওইদিন হরতাল কর্মসূচি থাকবে। সে জন্য তিনি গণভবনে যেতে পারবেন না। ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যার পর যে কোনো সময় আলোচনার জন্য আপনি (শেখ হাসিনা) ডাকলে তাতে আমি সাড়া দেব।
তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, আপনি সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রস্তাব দিয়েছি। এই দুটি প্রস্তাব সমন্বয় করে সমঝোতা হতে পারে বলে আমি মনে করি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোন সংলাপের সময়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী অতীত নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার কাছে অনেক অভিযোগ করেছেন। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, আমিও এমন অনেক কথা বলতে পারি। তাই আসুন অতীতের তিক্ততা বাদ দিয়ে জাতির আজকের সঙ্কট নিরসনের জন্য একসঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছি। আমরা অতীতকে ভুলে নতুন ধারার রাজনীতিতে যেতে চাই। আমরা এই ধারার ‘ফ্রেস স্ট্রার্ট’ (নতুন করে সূচনা) করতে চাই।
প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সর্বদলীয় প্রস্তাব সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা কী বলেছেন জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা যে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছি, তা মেনে নিন। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, আপনি সর্বদলীয় যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা জাতির কাছে গ্রহণ যোগ্য নয়। তারা মেনে নেয়নি। আমরা একদলীয়, দ্বিদলীয় ও বহুদলীয় ব্যবস্থা চাই না। এতে নানা মতের লোক নিয়ে ঝামেলা হবে। সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না।
লাল টেলিফোন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তুলে প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, লাল টেলিফোন যোগাযোগ করে আমি পাইনি। বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, এই লাল টেলিফোনটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। বারবার অভিযোগ করলেও তা সচল করা হয়নি। আজ (শনিবার) সংবাদকর্মীদের ডেকে তা দেখানো হয়েছে। এই টেলিফোনটি ডেড (অচল), কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
খালেদা জিয়ার বাসভবন সূত্রে জানা গেছে, সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর বিরোধীদলীয় নেতার রেড ফোন নষ্ট রয়েছে। এরপর এই ফোনে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেন।
প্রধানমন্ত্রীকে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, আপনি যদি সত্যিই আন্তরিকভাবে আমার সঙ্গে দিনে বা গতকাল রাতে কথা বলতে চাইতেন, তাহলে আজকের যুগে অনেক মাধ্যম আছে, তা দিয়ে করতে পারতেন। যে মাধ্যম দিয়ে (শেষ পর্যন্ত) আপনার স্টাফরা আমার স্টাফদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আপনি সারা দিন এক লাল টেলিফোনে চেষ্টা করেছেন, তা ঠিক হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, টেলিফোন বিভাগের একজন কর্মচারী আমার লাল টেলিফোন সচল আছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রচারণার চেষ্টা করেছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, এটা আমি দেখতে চাই।
টেলিফোনের আলাপের সময় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণতান্ত্রিক বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনে আমরা অতীতে একসঙ্গে কাজ করেছি। আপনার (শেখ হাসিনা) বাসায় গিয়েছি। আজ জাতির সঙ্কট মুহূর্তে জাতীয় ইস্যুতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।
প্রেস সচিব দুই নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনের আলাপকে শুভ সূচনা অভিহিত করে বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, আলোচনার যে সূচনা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী সংলাপ করে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে আশা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে দলের সহ-সভাপতি শমসের মবিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর, যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, মহানগর সদস্য সচিব আবদুস সালাম, সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কথা হলো চার বছর পর
গতকালের আগে দুই নেত্রীর দেখা বা যোগাযোগ হয়েছে চার বছর হলো। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে সেনাকুঞ্জের এক অনুষ্ঠানে দুই নেত্রীর সাক্ষাত্ ও আলাপ হয়েছিল। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক আমলের সাবজেলের স্মৃতি বিনিময়ও হয় তাদের মধ্যে।
একই বছরের মে মাসে ড. ওয়াজেদ আলীর মৃত্যুর পর শেখ হাসিনার বাসায় ছুটে যান খালেদা জিয়া। সেখানে শেখ হাসিনাকে সমবেদনা জানানা বিরোধীদলীয় নেতা। সেখানে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
তারপর চার বছর বন্ধ ছিল মুখ দেখাদেখি। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর সেনাকুঞ্জে এবং এ বছর ২১ মার্চ প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে বঙ্গভবনে দু’জন উপস্থিত হলেও তাদের মুখ দেখাদেখি হয়নি।

সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৩