শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৩

জারজনামা গোলাম মাওলা রনি

এই শতাব্দীর সেরা পণ্ডিত শ্রী নিরোদ চন্দ্র চৌধুরী বহু বছর আগে লিখেছিলেন ‘বাঙ্গালী জীবনে রমণী’ নামে এক অকাট্য প্রামাণ্য দলিল। নিরোদ বাবু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, আবহমান বাংলার গ্রামগঞ্জে নারী-পুরুষ কীভাবে অবাধ এবং নীতিহীন যৌনাচারে মেতে ওঠে এবং সমাজসংসারকে ফাঁকি দিয়ে একের পর এক জারজ সন্তান পয়দা করে। প্রায় ষাট বছর হতে চলল, কিন্তু আজ অবধি নিরোদ বাবুর বইকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কোনো বাঙালি লেখক কোনো বই রচনা করেননি।
দেশ-বিদেশের সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা বাবা-মায়ের অবৈধ সন্তানদের কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। প্রথমত, তারা কথায় কথায় অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে, যাকে আমরা সোজা বাংলায় বলি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ। এরা খুবই অধৈর্য প্রকৃতির এবং সন্দেহপ্রবণ হয়ে থাকে। কখনো কখনো তারা অতিমাত্রায় অত্যাচারী হয়ে ওঠে, আবার একই ব্যক্তি প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে ছোট করতে করতে পশুর পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাদের বিবেক বলতে তেমন কিছু থাকে না। ফলে তাবত্ বিশ্বে অনাদিকাল থেকে বাবা-মায়ের অবৈধ সন্তানরা সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি পরিবার কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে আসছে।
আজ আমার হঠাত্ করেই এসব কথা মনে পড়ল একটি কারণে। গতকাল ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত কাদের মোল্লার অন্তিম অনুরোধ রাখতে গিয়ে আমি একটি স্ট্যাটাস দিই। এর পর থেকে কিছু অমানুষের অশ্লীল বাক্যবাণে ফেসবুকের পাতা ভরে যেতে থাকে। ওদের পাশবিক অভিব্যক্তি কেবল তাদের বাবা-মায়ের কর্মকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
পৃথিবীতে মানুষ আসার পর থেকেই এক মানুষ অন্য মানুষের অন্তিম ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখায়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করা হয়। পছন্দমতো খাবার পরিবেশন কিংবা নিকটতম আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। আসামি যদি মুসলমান হয়, সেক্ষেত্রে মৌলভী ডেকে দোয়া-দরুদ পড়ানো হয়। কাদের মোল্লার অন্তিম মুহূর্তের একটি অছিয়ত পালন করে মানুষ হিসেবে আমি নিজের কর্তব্যটুকু পালন করেছি মাত্র।
যেসব তরুণ বন্ধুরা ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’ বলে দাবি তুলছেন, তাদের বলব— চলে যান ফরিদপুর জেলার সদরপুর থানার আমিরাবাদ গ্রামে। গ্রামের দীনদরিদ্র ঘনা মোল্লার ঘরে কাদের মোল্লা কত সালে জন্মগ্রহণ করেছিল সেই তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করুন। তারপর যান বাইশরশি শিব সুন্দরী একাডেমিতে। সেখানে কাদের মোল্লা প্রথমে ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়েন এবং পরে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। নিজের দরিদ্রতার জন্য তিনি এলাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পীর ধলামিয়া সাহেবের বাড়িতে লজিং থাকতেন। এই লজিং থাকার সময়কাল সম্পর্কে এলাকাবাসীর সাক্ষ্য নিন।
ধলামিয়া পীর সাহেবের পরিবার ব্রিটিশ আমল থেকে এলাকার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং সম্মানিত পরিবার হিসেবে পরিচিত। পীর সাহেবের বড় ভাই আবুল হাসানাত ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের আইজি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু আইজি সাহেবকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করতেন। পীর সাহেবের পরিবার মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন এবং তার মেয়ের জামাই গাফফার ইঞ্জিনিয়ার ফরিদপুর জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডো বাহিনীর প্রধান ছিলেন। এই গাফফার ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী ছিলেন কাদের মোল্লার ছাত্রী।
ঢাকা প্রেস ক্লাবে এসেও তার সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারেন। নির্মল সেন ও সন্তোষ গুপ্তের মতো সাংবাদিকরা যখন দেশের সাংবাদিক সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি হিসেবে কীভাবে দুইবার নির্বাচিত হলেন? তার চাকরিজীবনে উদয়ন স্কুল কিংবা বিডিআর পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়েও খোঁজ নিতে পারেন।
আমি যে তথ্যগুলো দিলাম তা কিন্তু আমার নয়। আসামিপক্ষ উত্থাপন করেছিল। সরকার নিয়োজিত প্রসিকিউটররা একটু চেষ্টা করলেই ওইগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে কেবল ঘটনাস্থল মিরপুরকে কেন্দ্র করে তথ্য-উপাত্ত এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করায় সংক্ষুব্ধ পক্ষ তাদের আপত্তি উত্থাপন করার সুযোগ পাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে এটা আপনার জন্য বিবেকের দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আপনি সবকিছু শুনবেন, নাকি কিছু কিছু শুনবেন এবং বাকিগুলো শুনবেনই না।
আমি যখন স্ট্যাটাসটি প্রথম লিখেছিলাম, তখন ধরে নিয়েছিলাম রাত ১২টা ১ মিনিটে তা কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে আজ যখন লিখছি তখন খবর এলো— কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে গেছে। ধারণা করা যায়, আজ রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা বা দায়দায়িত্ব নেই। আমার দায়িত্ব কেবল ততটুকুই যতটুকু আমি জানি এবং যতটুকু পর্যন্ত আমার ক্ষমতা কার্যকর। আল্লাহ পাক যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন তারাই ভালো জানবেন কিংবা বলবেন— দুনিয়া এবং আখিরাতে।
লেখক : আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য
(নিবন্ধটি তার ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া)

পঙ্কজ-সুজাতা বাংলাদেশীদের মুখ বিস্বাদ করে দিয়েছেন

১৩ ডিসেম্বর ২০১৩, শুক্রবার, ১০:৪০
একজন মানুষের মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী শোকের এমন বহিঃপ্রকাশ আগে মাত্র একবারই দেখেছিলামÑ ১৬ বছর আগে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুতে। সব জনমত অনুযায়ী সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রিটিশ রাজনীতিক ছিলেন স্যার উইনস্টন চার্চিল। ১৯৬৫ সালে তার শবযাত্রার ধারাবিবরণী প্রচারের সুযোগ আমার হয়েছিল। কিন্তু তখনো সাধারণ মানুষ কিংবা মিডিয়ার মধ্যে এমন ব্যাপক শোক, এমন আবেগ আর এমন আগ্রহ দেখিনি, যেমন দেখেছি নেলসন ম্যান্ডেলার মহাপ্রয়াণে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানার (ওলন্দাজ বংশোদ্ভূত) শাসকেরা সংখ্যাগুরু কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শাসন ও শোষণ চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে অ্যাপার্থাইড (বর্ণভেদ) পদ্ধতি চালু করেছিলেন। তারা ‘পাস ল’ জারি করে পাসবুক ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গদের শ্বেতাঙ্গ বসতি এলাকায় যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তরুণ আইনজীবী নেলসন ম্যান্ডেলা এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) দল প্রথমে আইনের সাহায্যে এবং পরে গান্ধীর মতো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সংখ্যাগুরুর অধিকার আদায় করে নেয়ার চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে তাদের সহিংস গেরিলা যুদ্ধ শুরু করতে হয়। ম্যান্ডেলা ও তার সহকর্মীরা গ্রেফতার হন। দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবাসের বিপুল গরিষ্ঠ অংশ ম্যান্ডেলা রোবেন দ্বীপে বন্দী ছিলেন। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে পাথর ভেঙে কুচি তৈরি করতে হয়েছে।
ম্যান্ডেলার অসহনীয় নির্যাতন ভোগ এবং আফ্রিকানদের অমানুষিক অবিচার বিশ্বমানবতার অন্তর স্পর্শ করেছিল। ম্যান্ডেলার মুক্তির ও অ্যাপার্থাইড পদ্ধতির অবসানের দাবিতে বহু দেশে আন্দোলন শুরু হয়। এসব দাবির সপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপের দাবি ওঠে সর্বত্র। কিন্তু সাবেক সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার ও প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে দাবি মেনে নেয়নি। তারা অ্যাপার্থাইড সরকারকে সমরাস্ত্রসহ যাবতীয় উপকরণ সরবরাহ করে যায়। সেসব অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করে চলে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ। লন্ডনে-নিউ ইয়র্কে ছাত্রজনতা দিনের পর দিন অবরোধের দাবিতে প্রায়ই সহিংস আন্দোলন করে। ব্রিটিশ লেবার দলীয় সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী পিটার হেইন ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বিপ্লবী লেখক তারিক আলী সে আন্দোলনেই খ্যাতি লাভ করেন। টোরিদলীয় প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ঘৃণাভরে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় এএনসিকে সন্ত্রাসী দল বলে ঘোষণা করেন। বর্তমান টোরিদলীয় প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সে সময় একটি ব্রিটিশ কোম্পানির হয়ে বাণিজ্যিক অর্ডারের তদবির করতে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার পরবর্তী সময়ে তার সরকারি বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ম্যান্ডেলাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ম্যান্ডেলার প্রয়াণে ডেভিড ক্যামেরন তার মৃত্যুকে সর্বোজ্জ্ব¡ল একটি আলোকবর্তিকা নিভে যাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ম্যান্ডেলাকে তার অনুপ্রেরণার উৎস বলে বর্ণনা করেছেন। ওবামা বলেছেন, ম্যান্ডেলার কথা মনে হলেই ব্যক্তি হিসেবে তার আরো ভালো হতে ইচ্ছে করে। ১০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার জোহানেসবার্গের বিশ্বকাপ ফুটবল স্টেডিয়ামে ম্যান্ডেলার স্মৃতি অনুষ্ঠানে ৯০ হাজারেরও বেশি লোক যোগ দেবেন বলে আশা করা হয়েছিল। মুষল বৃষ্টি সত্ত্বেও ৫০ হাজারের বেশি লোক এসেছিলেন। সেখানে বাঘে-ছাগলে যেন এক ঘাটে পানি খেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা আর আমেরিকার চিরশত্রু কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রো মুখোমুখি হয়েছেন, করমর্দন করে কথা বলেছেন এবং একই মঞ্চ থেকে ম্যান্ডেলার উদ্দেশে শ্রদ্ধানিবেদন করেছেন। তিনজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ আর জিমি কার্টার যোগ দিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে। যোগ দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং তিনজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন, টোনি ব্লেয়ার ও জন মেজার।

ম্যান্ডেলার প্রতি বিশ্বমানবের শ্রদ্ধার্ঘ্য
প্রায় ১০০ দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও প্রেসিডেন্ট ক্যাস্ট্রো ছাড়াও চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ব্রাজিল ও ভারতের রাষ্ট্রপতিরা ভাষণ দিয়েছেন সে অনুষ্ঠানে। রোববার ১৫ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব ট্র্যানস্কি প্রদেশে ম্যান্ডেলার পিতৃগ্রামে তাকে সমাহিত করা হবে। ম্যান্ডেলার কারাজীবনের প্রায় ২০ বছর তাকে পাহারা দিয়েছেন উগ্র অ্যাপার্থাইডপন্থী শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার গ্রেগরি। তিনি তার বইতে লিখেছেন, কারামুক্তির মুহূর্তে ম্যান্ডেলা করমর্দনের জন্য তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমি ভুলব না’। গ্রেগরি লিখেছেন, তিনি তখন কান্না চেপে রাখতে পাারেননি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ম্যান্ডেলার অভিষেকে গ্রেগরি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।
কারাভোগের শেষের বছরগুলোতে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ছিলেন এফ ডব্লিউ ডি কের্ক। শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে গিয়ে ডি কের্ক বলেছেন, কারামুক্ত হয়ে ম্যান্ডেলা তার অফিসে এলেন। তাকে দেখেই ডি কের্কের মনে হয়েছিল যে, লোকটিকে তার ভালো লাগবে। ম্যান্ডেলা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা এক দেশে আছি, আমাদের একসাথে (মিলেমিশে) কাজ করতে হবে। ডি কের্ক নাকি তখনই ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু ম্যান্ডেলা চার বছর পরের নির্বাচন পর্যন্ত তাকে স্বপদে বহাল থাকতে অনুরোধ করেন। ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে চাননি। দলের ও দেশের পীড়াপীড়িতে এক মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করলেও দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি কিছুতেই প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হননি। মঙ্গলবারের স্মৃতি অনুষ্ঠানে ডি কের্কও উপস্থিত ছিলেন। এই হচ্ছে একটা মানুষের একটা পরিমাপ। তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত (এফ ডব্লিউ ডি কের্কের সাথে যৌথভাবে) করে নোবেল কমিটি অবশ্যই নিজেদের ধন্য মনে করেছিল। নিজের পরিবর্তে অন্য কাউকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে বলে যারা মেয়েশিশুর মতো কান্নাকাটি করে সব কিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে দেন, তারা কি নিজেদের ম্যান্ডেলার নখের তুল্য বলেও মনে করেন? নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশেও গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা তখন প্রথম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী। সে সময় এক কলামে তাকে ম্যান্ডেলার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি কি কখনো নিজের কথা ছাড়া আর কারো কথা শোনেন? ম্যান্ডেলার মাহাত্ম্যের একটু হাওয়াও কি তাদের গায়ে লেগেছে? ম্যান্ডেলা মহামানব ছিলেন এ কারণে যে, প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা নয়, ক্ষমা ও সমঝোতাকে তিনি জীবনের আদর্শ করে তুলেছিলেন। ক্ষমা ও সমঝোতা শব্দ দুটো যে অভিধানে আছে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জানে বলে মনে হয় না। ম্যান্ডেলার স্মৃতিতে বাংলাদেশ সরকার তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে। ম্যান্ডেলাকে অনুসরণ করলেই বলা যাবে, আন্তরিকতা আছে এই কর্মসূচিতে।

হাসিনার রাজনীতি এবং সুজাতার উসকানি
বাংলাদেশের মানুষ এখন নিজেদের বর্তমান দেখে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে শোকাপ্লুত। শেখ হাসিনা নিরপেক্ষ নির্বাচনে রাজি নন, অতএব সংলাপের পথেও তারা যাবেন না। তারা জানেন এবং গোটা বিশ্ব জানে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয় অনিবার্য। হাসিনা গোঁ ধরে বসে আছেন মধ্যযুগীয় রাজা-বাদশার মতো : লোকে সমর্থন করুক কী না-ই করুক  সিংহাসনে বসে থাকব। ভারত ছাড়া আর কেউ তাকে সমর্থন করছে না। ভারত অবশ্যই সে মূল্য আদায় করে নিচ্ছে এবং নেবে। তারা বাংলাদেশের সড়ক, নৌ, রেলপথ ও সমুদ্রবন্দরগুলো বিনামূল্যে আদায় করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া সে ‘উপহার’ আর কেউ ভারতকে দেবে না। সুতরাং যেকোনো মূল্যে দলটিকে গদিতে রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে ভারত সরকার।
মনে হচ্ছে, সে প্রক্রিয়া অনুসারে ভারত সব দিক দিয়ে বাংলাদেশকে একটা ব্যর্থ ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এক দিনের সফর করে গেছেন। তার পিতা ষড়যন্ত্র করে সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সুজাতা নিজে অস্ট্রেলিয়া সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করে পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য অস্ট্রেলিয়ার ইউরেনিয়াম আদায় করে নিয়েছিলেন। চাণক্যের উপযুক্ত শিষ্যা তিনি। অবশ্যই তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশের সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে আরো উসকানি দিয়ে যেতে। সুজাতা বলে গেছেন, যেসব দল অংশ নিতে রাজি আছে তাদের নিয়ে নির্বাচন করলেই সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে। একই দমে তিনি বলেছেন, ‘সেটা বাংলাদেশের মানুষই স্থির করবে।’
সুজাতা আরো বলেছেন, গণতন্ত্র একেক দেশে একক রকম হয়। বাংলাদেশের মানুষ, কিন্তু জানে গণতন্ত্র মানেই হলো, গণতন্ত্র। তারা জানে স্ট্যালিনের একদলীয় নির্বাচনকে গোটা বিশ্ব গণতন্ত্র বলে গ্রহণ করতে রাজি হয়নি এবং সে জন্যই অর্ধশতাব্দীজুড়ে বিশ্বব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধ হয়েছিল। অবশ্যি সুজাতার দেশ ভারত সে অর্ধ শতাব্দী ধরে স্বৈরতন্ত্রী স্ট্যালিন ও তার উত্তরসূরি সোভিয়েত ইউনিয়নের লেজুড় ছিল। বাংলাদেশের মানুষের আরো মনে আছে, আইয়ুব খানের কনভেনশন মুসলিম লীগের নির্বাচন কিংবা ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্রকে’ গণতন্ত্র বলে মানতে তারা রাজি হয়নি। আজো তারা গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচন চায়, সুজাতা সিংয়ের মতলবি গণতন্ত্র নয়।

বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামী
সুজাতা সিং তার গণতন্ত্রের সপক্ষে বলে গেছেন, শেখ হাসিনা গদিতে না থাকলে বাংলাদেশ ‘ইসলামী সন্ত্রাসী’ হয়ে যাবে। ভারত সরকার এমনই অন্ধ হয়ে গেছে যে, প্রকৃত পরিস্থিতি তাদের চোখে পড়ে না। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ ধর্মভীরু মুসলমান। তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দাড়ি রাখে আর টুপি পরে মসজিদে যায় এবং এ দেশে ধর্মীয় রাজনীতি আছে। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী আছে, যেমন ভারতে আছে বিজেপি, শিব সেনা প্রমুখ হাজারো উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল। তাদের কেউ কেউ ২০ কোটি মুসলমানকে ভারতের নাগরিক বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙায় বড় ভূমিকা ছিল বিজেপির। সে দলের শীর্ষনেতারা নিজের হাতে মসজিদ ভেঙেছেন। ২০০২ সালে গুজরাটের বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উৎসাহ ও সাহায্যে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় দুই হাজার মুসলমান প্রাণ হারান।
মোদি তার তদন্ত কিংবা বিচার করেননিÑ যেমন বাংলাদেশ সরকার বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ ধামাচাপা দিয়ে রাখছে। শেষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টই এই দাঙ্গা আর মোদির ভূমিকা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজো নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা দিতে অস্বীকার করছে। আগামী বছরের নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হলে নরেন্দ্র মোদি হবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেই ভারতের মুখে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির নিন্দা পরিহাসের মতোই শোনায়। প্রকৃত পরিস্থিতি হচ্ছে, বর্তমান সরকার তার বিদেশী মুরব্বিদের মনোরঞ্জনের জন্য মুসলিম নির্যাতন করে দেখাতে চাইছে যে, তারা সন্ত্রাস দলন করছেন। ওদিকে যতই নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে, বাংলাদেশী মুসলমানের ধর্মীয় অনুরাগ ততই বেড়ে চলেছে। এ সরকার গদিতে আসার আগে তো হেফাজতে ইসলাম বলে কোনো আন্দোলন বাংলাদেশে ছিল না!
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের অবাঞ্ছিত ও অশোভন হস্তক্ষেপের সমালোচনা অনেকে করেছেন। অন্যরা অবিশ্বাস আর ক্ষোভে মুখ ফিরিয়ে আছেন। তার ওপর ‘রঙের ওপর রসান চড়ালেন’ সুজাতা সিং। পঙ্কজ শরণ ও সুজাতা সিংয়ের  বোঝা উচিত, ভারতের আধিপত্যবাদ এবং সাম্প্রতিক অন্যায় হস্তক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের মানুষের মুখ বিস্বাদ হয়ে আর মন বিষিয়ে গেছে। দুই বছর আগে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছিলেন, জামায়াতে ইসলামী ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মন বিষিয়ে দিচ্ছে। সেটা কতটা সত্যি জানি না, কিন্তু ইদানীং অন্যদের গোপন এবং পঙ্কজ শরণ ও সুজাতা সিংয়ের প্রকাশ্য ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষের মন বিষয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সে কাজে আর জামায়াতে ইসলামীকে কিছু করতে হবে না।

অশুভ জন্মলগ্ন!
আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে একটা ‘অশুভ প্রেতাত্মা’ যেন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে তারিখটাÑ ২৩ জুন ১৯৪৮Ñ ছিল পলাশী যুদ্ধের বার্ষিকী। ১৭৫৭ সালের ওই একই তারিখে পলাশীর আম্রকাননেই মীর জাফর ও তার সহষড়যন্ত্রকারীরা বাংলার স্বাধীনতা ইংরেজের হাতে তুলে দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের এবং তার উত্তরসূরি বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে তাদের জীবনের মূল ব্রত বলে স্বীকার করে নিয়েছে। এ দেশের জনতার আন্দোলনেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিব মুক্তি পেয়েছিলেন।
একাত্তরে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের চলে গেলেন। এদিকে বাংলাদেশের জনতা তার অনুপস্থিতিতেই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। অবশ্যি মুজিবের সপক্ষে বলতেই হবে, একাত্তরে তাজউদ্দীন আহমদের সাথে ভারতের সাত দফা চুক্তি মেনে নিতে তিনি অস্বীকার করেছিলেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী তুলে নিতে ইন্দিরা গান্ধীকে বাধ্য করেছিলেন। আওয়ামী লীগের বর্তমান নেত্রী কি দেশের মানুষকে বিশ্বাস করেন না? তিনি জনতার স্বার্থ ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলে গেছেন।
আওয়ামী লীগের চরিত্রের আরেকটা ত্রুটি, তারা ফাঁকা মাঠে রাজনীতি করতে ভালোবাসে। স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীকে দিয়ে ৪০ হাজার সমালোচক ও বিরোধীকে হত্যা করা হয়েছিল। ৩০০ সদস্যের সংসদে মাত্র চার-পাঁচজন সদস্য মুজিবের সমালোচক ছিলেন। সেটাও সহ্য হয়নি। একদলীয় সংসদ গঠনের লক্ষ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের কথা ভুলে গিয়ে তিনি মধ্য মেয়াদে বিভাজক নির্বাচন করেছিলেন। পত্রপত্রিকায় অশাসন-কুশাসনের সমালোচনা হচ্ছিল। তিনি সব বেসরকারি পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিলেন। তিনি রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একদলীয় ব্যবস্থায় আজীবন রাষ্ট্রপতি হতে চেয়েছিলেন।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গোড়া থেকেই বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে বাধা দিয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধী ও সমালোচকদের বিচারবহির্ভূত হত্যা আর গুম-খুন করছে, হাজার হাজার লোককে কয়েদ করে রেখেছে। বিরোধী দলের সমর্থক পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দিয়ে, ১৯ জন সাংবাদিকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এবং মাহমুদুর রহমানসহ সমালোচকদের মিথ্যা মামলায় বন্দী করে বিরোধী দলের বাকরোধ করেছে। ওদিকে গৃহপালিত মিডিয়া দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বিরোধী দল এবং তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে চলেছে। বিএনপি ও অন্য বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাইকেই মিথ্যা মামলায় জেলে পুরে রাখা হয়েছে। এভাবে তারা নির্বাচন করতে চায়, এটাকে তারা রাজনীতি বলে। আপনাদের কি নিচের কবিতাটির কথা মনে পড়ে না?
‘বাবুরাম সাপুড়ে/কোথা যাস বাপুরে/ আয় বাবা দেখে যা/ দুটো সাপ রেখে যা/ যে সাপের দাঁত নেই, চোখ নেই/ করে নাকো ফোঁস-ফাঁস/ মারে নাকো ঢুঁস-ঢাঁস/ সেই সাপ জ্যান্ত/ গোটা দুই আন তো/ তেড়ে মেরে ডাণ্ডা/ করে দিই ঠাণ্ডা।naya diganta

সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

শাহবাগিদের দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি, ইমরান সরকারকে দেশত্যাগে বাধা




তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার অতিগোপনে দেশ ছেড়ে কানাডা যাওয়ার চেষ্টা করেও শাহজালাল বিমানবন্দরে পুলিশের বাধার কারণে যেতে পারেননি। শনিবার রাত ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
আগামী ২৪ ডিসেম্বর ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের ঘোষিত মহাসমাবেশ ঠেকাতে ইমরান এইচ সরকারকে সরকার মাঠে রাখতে চায় বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা অভিযোগ করেছেন।
ডা. ইমরান কোনোভাবে বিদেশে যেতে পারলে আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে না পারলে তিনি আগামী কয়েক বছর দেশে ফিরবেন না বলেও তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন।
এ নিয়ে অনলাইন নিউজ এজেন্সি ‘এ ওয়ান নিউজ’ খবর প্রকাশ করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে।
এদিকে শাহবাগি আন্দোলনের ১১ নেতা কানাডার ভিসা পেয়েছেন বলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে।
এছাড়া গায়ক প্রীতম আমেরিকার, ব্লগার অমি রহমান পিয়াল কানাডার, নির্ঝর মজুমদার আমেরিকার, রাকিবুল বাশার ফিনল্যান্ডের, মারুফ রসুল লন্ডনের, দেওয়ান তকি ফ্রান্সের, ইয়াসিন ফিদা হোসেন আমেরিকার, মাহমুদুল হক মুন্সী আমেরিকার ভিসার জন্য চেষ্টা করছেন বলে এসব মাধ্যমে বলা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন অনুষ্ঠানে ঘোষিত তফসিল বাতিল দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের লাগাতার নজিরবিহীন আন্দোলনে ভীত হয়ে নিরপেক্ষতাহীনতার অজুহাতে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন ডা. ইমরান এইচ সরকারসহ শাহবাগি আন্দোলনের নেতারা।
তাছাড়া ব্লগে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-কে নিয়ে জঘন্য কুত্সা রটনাকারী ব্লগারদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা আন্দোলনের দাবিতে ফের আগামী ২৪ ডিসেম্বর ঢাকায় হেফাজতের মহাসমাবেশ করার ঘোষণায়ও শাহবাগি আন্দোলনের নেতারা আতঙ্কিত বলে জানা গেছে।
তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কথিত গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা দেশ ছাড়তে চাইছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জল্পনা-কল্পনা চলছিল।
তাছাড়া আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই গণজাগরণ মঞ্চের নেতাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে আপদ মনে করছেন। তাদের কারণেই দলের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে বলে মনে করছেন গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের অন্যতম সহযোগী, পৃষ্ঠপোষক, সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগ। তাদের কারণেই পাঁচ সিটি নির্বাচনে দলের ভরাডুবি হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির অনেক নেতা।
আওয়ামী লীগের এসব নেতা মনে করছেন, বিরোধী দলের লাগাতার আন্দোলনের মাঝে হেফাজতসহ ইসলামপন্থীরা মাঠে নামলে শাহবাগি আন্দোলনের নেতারা টার্গেট হতে পারেন, তখন তাদের রক্ষায় প্রশাসন আগের মতো আন্তরিক নাও হতে পারে। এসব চিন্তা থেকে দলটির অনেক নেতাই চাইছেন, গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা আপাতত বিদেশে চলে যাক।
এসব কারণে শাহবাগি আন্দোলনের নেতা ডা. ইমরান এইচ সরকার দেশ ছেড়ে কানাডায় যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দর থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ডা. ইমরান এইচ সরকার তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেয়া হলো কেন—এ বিষয়ে পুলিশের কাছে জানতে চাইলেও তাকে কোনো উত্তর দেননি পুলিশ কর্মকর্তারা। তাকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আপনাকে দেশের বাইরে যেতে না দেয়ার জন্য উপরের নির্দেশ রয়েছে।’
ডা. ইমরানের ঘনিষ্ঠ গণজাগরণ মঞ্চের এক কর্মী অভিযোগ করেন, নির্বাচন সামনে রেখে হেফাজত ১৩ দফা বাস্তবায়নের নামে নতুন করে ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টি করতে চাইছে।
আগামী ২৪ ডিসেম্বর সংগঠনটি সমাবেশ কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছে। হেফাজত মাঠে নামলে গণজাগরণ মঞ্চকেও সরকার মাঠে চায়। এজন্যই সরকার ডা. ইমরানকে আপাতত দেশের বাইরে যেতে দিতে চাইছে না।
এ ব্যাপারে ওসি ইমিগ্রেশন বেল্লাদ হোসেন জানান, রাত ১০টার আগে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি-না তা আমার জানা নেই।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে কথিত গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে আন্দোলন করে দেশজুড়ে নিন্দিত হন ডা. ইমরান।
জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্কের ব্যানারে এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার শাহবাগে রাস্তা বন্ধ করে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়। আওয়ামী মিডিয়ার প্রচারের বদৌলতে অল্পদিনেই আন্দোলন দেশ-বিদেশে আলোচনায় উঠে আসে। আন্দোলনকারীদের তিন-চার স্তরের নিরাপত্তা দেয় সরকার। পাশাপাশি সরবরাহ করা হয় বিরিয়ানির হাজার হাজার প্যাকেট। ইমরান এইচ সরকার তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে দেশব্যাপী জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বলেন।
এ অবস্থায় আমার দেশসহ দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশ হয় ব্লগারদের জঘন্য আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-কে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী লেখা। তাদের ফাঁসির দাবিতে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম নামের অরাজনৈতিক সংগঠনের। ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম মহাসমাবেশ করে সংগঠনটি। একই রাতে ঘুমন্ত ও জিকিররত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।amerdesh


শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৩

সুজাতা সিং-এর বাংলাদেশ সফর : পিণ্ডির শৃঙ্খলমুক্ত স্বাধীনতা কী দিল্লির দাসত্বের জন্য!

ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশে ২১ ঘণ্টা ঝটিকা সফরের পর নানা বিষয় নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। সুজাতা সিং আবারো ইন্ডিয়ার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের জনগণের সামনে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাত্ এবং সংবাদ সম্মেলনে ইন্ডিয়ার আসল ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশকে তারা ইতোমধ্যে একটি করদরাজ্য হিসেবেই মনে করছেন। আর এটা মনে করার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। তার এই আচরণে প্রশ্ন উঠেছে মানচিত্রে স্বাধীন হলেও সার্বভৌমত্বে স্বাধীন আছে কি বাংলাদেশ? গত ৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী-বাম জোট বাংলাদেশকে উজাড় করে দিয়েছে ইন্ডিয়ার স্বার্থে। হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছে ইন্ডিয়াকে। কোনো রকমের রাখডাক না করে সুজাতা সিং যে ভারত আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চায় একেবারে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। একটি দেশের নির্বাচন নিয়ে অপর কোনো রাষ্ট্র এরকম মন্তব্য সার্বভৌম কোনো জাতির জন্য নিতান্তই লজ্জার বিষয়। আমরা কী তাহলে সত্যিই একটি সার্বভৌম জাতি! মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদ প্রাণ উত্সর্গ করেছিলেন এরকম একটি বাংলাদেশের জন্য! লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কী তাহলে ইন্ডিয়ার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য! ১৬ কোটি মানুষের ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ইন্ডিয়ার অভিপ্রায় বাস্তবায়নের জন্যই কী ছিল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম।
ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশ সফরে অনেক কথাই বলেছেন। বৈঠক করেছেন মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ১৮ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠক করেছেন সুজাতা। কি কথা হয়েছে দু’জনের মধ্যে কেউ জানেন না। একান্ত বৈঠকের পর গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী শেখ হাসিনা ফুরফুরা মেজাজে রয়েছেন। কোনোকিছু কেয়ার করছেন না। যে কোনো মূল্যে তাদের সাজানো নির্বাচন করতে মরিয়া। একান্ত বৈঠকে এমন কী ইশারা পেয়েছেন শেখ হাসিনা তা তার ফুরফুরা মেজাজেই আভাস দিচ্ছে।
ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফরের বক্তব্য অনেক তাত্পর্যপূর্ণ। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি মন্তব্য পর্যালোচনা করলে সবই পরিষ্কার হয়ে যায়। আগামী নির্বাচন, ক্ষমতায় কাকে দেখতে চায়, সব দল নয়, অধিকসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ হলেই চলবে এমন সবই বলে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন নয়, নির্বাচনে ইন্ডিয়ার অভিপ্রায়ের প্রতিফলন দেখতে চায় সুজাতা। যেমন-(ক) জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি জাতীয় পার্টিকে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে এরশাদের ভাষায় সুজাতা সিং তাকে বলেছেন, নির্বাচনে না গেলে অন্য কেউ ক্ষমতায় আসলে জামায়াতে-শিবিরের উত্থান হবে। এখানে একেবারেই স্পষ্ট, তিনি এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ করেছেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বাংলাদেশের মানুষ কাদের নির্বাচিত করবে সেটা নিয়েও হুশিয়ার করছেন এরশাদ সাহেবকে। অর্থাত্ ইন্ডিয়া ভালো করেই জানে নীল-নকশার নির্বাচন না হলে তাদের পদলেহনকারীরা পরাজিত হবে। ক্ষমতায় আসবে বিরোধী দলীয় জোট।
(খ) সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সুজাতা সিং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে দেখতে চায় ভারত। অধিকসংখ্যক দল অংশ নিলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।
খোলামেলা এই বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেছেন বিরোধীদলীয় জোটকে বাইরে রেখেই নির্বাচন চায় ভারত। জাতিসংঘ, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ, চীন, জাপান, কানাডাসহ দুনিয়ার সব দেশ সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে। আর সে জায়গায় সুজাতা সিং বললেন ভারত অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ দেখতে চায়। তাদের নীল নকশা অনুযায়ী প্রধান বিরোধীদলীয় জোটকে বাইরে রেখে এরশাদের দল জাতীয় পার্টিকে গৃহপালিত বিরোধী দল বানানোর চেষ্টা ছিল। যাতে আগামীতে পার্লামেন্টে সিকিমের লেন্দুপ দর্জির মতো বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলেও কেউ বিরোধিতা না করে।
সিকিম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে লেন্দুপ দর্জি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে সিকিমকে ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশকে গত ৭ বছরে লেন্দুপ দর্জির মতো ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে ঘোষণা না দিলেও জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের মাধ্যমে সব উজাড় করে দেয়া হয়েছে ভারতকে। এমনকি ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন মুদ্রা চালুর প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ট্রানজিটের নামে ভারত করিডোর চেয়েছে। বিনাশর্তে তা দেয়া হয়েছে। কোন শর্তে ট্রানজিটের নামে ভারতকে করিডোর দেয়া হয়েছে—বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছিল। তখন শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মসিউর রহমান কিছুটা স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে বলেছিলেন—বন্ধুরাষ্ট্রকে ট্রানজিটের বিনিময়ে কিছু চাওয়া হবে অসভ্যতা! তার এই উক্তির মাধ্যমেই প্রকাশ হয় এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাতায়াতে শর্তহীন করিডোর দিতে কতটা উদারতা দেখিয়েছে শেখ হাসিনা।
সিলেট বিভাগসহ বাংলাদেশের একটি বিশাল এলাকা মরুভূমিতে রূপান্তর হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ভারতকে টিপাইমুখ বাঁধ দেয়ার বিষয়টি অনুমোদন করে শেখ হাসিনা সরকার। তখনও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছিলেন—আগে বাঁধ দেয়া হোক, তারপর দেখা যাবে আমাদের কতটুকু ক্ষতি হয়। বাঁধ না দিলে তো আর সেটা বোঝা যাবে না! কিন্তু নদী বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সবাই সতর্ক করেছেন টিপাইমুখ বাঁধ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের সুরমা- কুশিয়ারা নদী শুকনো মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো পানির নদী হিসেবে পরিচিত মেঘনা শুকিয়ে যাবে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে বাংলাদেশের বিশাল অঞ্চল তলিয়ে যাবে। এছাড়া হারিয়ে যাবে সিলেট অঞ্চলের হাওরের বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে জেনেও টিপাইমুখ বাঁধের অনুমোদন দেয় আওয়ামী সরকার।
ভারতের পূর্বাঞ্চল ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানায় বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি নিতে হবে। শেখ হাসিনার সরকারের কল্যাণে নৌ ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের ভারী মালামাল প্রথমে আনা হয় আশুগঞ্জ নদীবন্দরে। সেখানে থেকে দেড়শ’ চাকার বিশাল গাড়িতে করে ভারী যন্ত্রপাতি বহনের মতো ব্রিজ, কালভার্ট নেই সড়কপথে। এজন্য ভারত নিজেই বাংলাদেশের তিতাস নদীসহ ১৮টি ছোট-বড় নদী এবং খালে বাঁধ দেয়। পানির প্রবাহ বন্ধ করে ভারী যানবাহন যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করা হয়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে যেটা কল্পনাও করা যায় না; অথচ সেটাই বাংলাদেশের ভেতরে করেছে ভারত। বাংলাদেশে একটি দাসত্ব মনোভাবের সরকার থাকার ফলেই এসব সম্ভব হয়েছে।
(গ) সংবাদ সম্মেলনে সুজাতা সিং আরও স্পষ্ট করেই বলেছেন, নিরাপত্তাজনিত সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি বিরাজমান এবং বলেছেন ভারত চায় সেটা অব্যাহত থাকুক। সুজাতা সিং এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বস্তিদায়ক। বাংলাদেশের মানুষ যা-ই ভাবুক না কেন, তারা এ সরকারকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়।
নিরাপত্তার দিক থেকে কতটা স্বস্তিদায়ক—সেটা আমাদের সীমান্তের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সীমান্তে প্রতিনিয়ত ভারতীয় হানাদার বিএসএফ বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা করছে। সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতীক হয়ে আছে কাঁটাতারে ঝুলন্ত কিশোরী ফেলানীর লাশ। সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামে বর্গির মতো হানা দিয়ে বাংলাদেশে নিরীহ কৃষকদের গরু-ছাগল ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে মুক্তিপণের বিনিময়ে কারওটা ফেরত পায় আবার কেউ ফেরত পায় না। সীমান্তে বাংলাদেশী যুবকদের ধরে নিয়ে উলঙ্গ করে বিএসএফ ক্যাম্পে নির্যাতনের বীভত্স চিত্র ইথারে ভাসে। গত ৫ বছরে দেড় হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে অসংখ্য। সীমান্তে হানা দিয়ে বাংলাদেশের জমিতে চাষাবাদরত কৃষক এবং রাখাল নিধনের সংবাদও প্রকাশ হয় অহরহ।
অথচ একটি ঘটনারও কোনো কার্যকর প্রতিবাদ নেই। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রতি বছর যত নাগরিক বিএসএফ হত্যা করে, দুনিয়ার আর কোনো সীমান্তে এতটা হত্যাকাণ্ড ঘটে না। এমনকি বিরোধপূর্ণ ইসরাইল-ফিলিস্তিন সীমান্তেও নয়। এটাই হলো সুজাতা সিংদের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক সম্পর্কের নমুনা! কারণ কোনো ঘটনা এবং হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ নেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। এজন্য ভারত বাংলাদেশে এরকম সেবাদাস সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে মরিয়া।
অপরদিকে একনজরে দেখা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ঝুলে থাকা ন্যায্য পাওনা আদায় করা সম্ভব হয়নি। ন্যায্য প্রাপ্তি আদায়ের হিসাবটাও শূন্যের ঘরে। স্বাধীনতার পর থেকে বিরোধপূর্ণ সীমান্ত চিহ্নিতকরণের চুক্তি হয়ে আছে। চুক্তি হয়ে আছে ছিটমহলগুলোর সমস্যা সমাধানের। কিন্তু ভারত সেগুলো আজও বাস্তবায়ন করেনি। বরং স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের অনুমোদনে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে রাজশাহী অঞ্চলকে মরুভূমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। তিস্তা নদীর উজানে গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে ন্যায্য পাওনা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে শুকিয়ে মরুভূমিতে রূপান্তর হচ্ছে তিস্তার দুই পাড়ের ভূমি। এমনিভাবে স্বাধীনতার পর ৪২ বছরে ৫৪টি অভিন্ন নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করছে ভারত। আমাদের ন্যায্য হিস্যার পানি প্রত্যাহার করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। ৪২ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা একটি সমস্যারও সমাধান করেনি। বরং নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করে বাংলাদেশের উর্বর ভূমিকে মরুভূমিতে রূপান্তরের প্রচেষ্টা নিরন্তর চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। আর এটাই হচ্ছে সুজাতা সিংয়ের ভাষায় স্বস্তিদায়ক সম্পর্কের নমুনা। বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি প্রসঙ্গে এখানে কিছু নাইবা আনলাম।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের সব নাগরিকেরই প্রত্যাশা। তবে ন্যায্য পাওনা ঝুলিয়ে রেখে শুধু উজাড় করে দেয়ার নাম যদি বন্ধুত্ব হয়, তাহলে সেই বন্ধুত্ব মানুষ চায় না। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিনাসী আওয়ামী-বাম জোট সরকার সেটাই করেছে ভারতের সঙ্গে। এজন্যই তো ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন, তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে সহযোগিতা করে প্রতিদান দিতে চায়। বিশেষ বিমানে উড়ে এসে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা বলে গেছেন—সব দল নয়, সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনই বাঞ্ছনীয়। মওলানা ভাসানীর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই। আর তা হলো—‘পিন্ডির শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছি দিল্লির দাসত্বের জন্য নয়’।
লেখক : দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত

শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

বিদায় ম্যান্ডেলা : কাঁদছে বিশ্ব


বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বিশ্বনন্দিত নেতা, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা আর নেই।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় জোহানেসবার্গের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ম্যান্ডেলা দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের জটিলতায় ভুগছিলেন।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। কয়েক মাস হাসপাতালে থাকার পর সম্প্রতি নিজের বাসভবনেই নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন তিনি।
ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বের মানুষের মনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে ম্যান্ডেলার মৃত্যু ঘোষণা করে বলেন, ‘আমরা হারিয়েছি আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।’
দক্ষিণ আফ্রিকাকে নতুন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছিলের দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জাতির পিতা।
প্রেসিডেন্ট জুমা জানান, ১৫ ডিসেম্বর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হবে। যতদিন পর্যন্ত নেলসন ম্যান্ডেলাকে সমাধিস্থ করা না হবে ততদিন পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। ভাষণে জুমা বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, আমাদের সবার প্রিয় নেলসন ম্যান্ডেলা চলে গেছেন। নিজের বাড়িতেই শান্তিপূর্ণভাবে তিনি মারা গেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানতাম যে বিদায়ের এই দিন একদিন আসবে। কিন্তু তবুও, তার বিদায়ে আমরা যে গভীর বেদনা পেয়েছি, যে অপূরণীয় ক্ষতি আমাদের হয়েছে, তা কিছুতেই কমানো সম্ভব নয়।’
১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই জন্ম নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তবে নিজের দেশের মানুষের কাছে অনেক বেশি পরিচিত ‘মাদিবা’ নামে। এটি তার গোত্র নাম। নিজের গোত্রে অজ গ্রামীণ জীবন থেকেই তার উত্থান। তার বাবা ছিলেন ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের থেম্বো রাজকীয় পরিবারের কাউন্সিলর।
দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ সমপ্রদায়ের আধিপত্য, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক শাসন ব্যবস্থা চলছিল তখন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন নিয়ে রাস্তায় নামেন ম্যান্ডেলা। প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডের অপরাধে দীর্ঘ ২৭ বছর তিনি কারাবন্দি জীবন কাটিয়েছেন। তার নেতৃত্বেই গত শতকের নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসনের আধিপত্যের অবসান ঘটে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। ৩০ বছরের সংগ্রামের পরে দেশটিতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গরা ধীরে ধীরে নমনীয় হতে শুরু করলে দেশ পুনর্গঠন ও ক্ষমা ঘোষণা করার ক্ষেত্রেও বিলম্ব করেননি মহান এই নেতা।
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সব জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে প্রথম নির্বাচনে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৯ সালে তিনি রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি আফ্রিকার অন্যান্য দেশের নেতাদের জন্যও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ নেতা এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন ম্যান্ডেলা।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যান্ডেলার সামনে ছিল বর্ণবাদের ভিত্তিতে অসমতা ও বঞ্চনায় কয়েক যুগ ধরে পিষ্ট হতে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে একত্রিত করার বিপুল কর্মযজ্ঞ। দায়িত্ব নেয়ার পর এ লক্ষ্যেই কাজ করে গিয়েছিলেন তিনি।
তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে বর্ণবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের সময়ে উভয়পক্ষের দ্বারা সংঘটিত অপরাধসমূহের বিচার করেন। এর মধ্যে দিয়ে জাতিগত দাঙ্গার ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায় দেশটির নাগরিকরা।
২০১০ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলার সময় শেষবারের মতো জনসমক্ষে আসেন ম্যান্ডেলা। সোয়েতোর সেই স্টেডিয়ামে ৯০ হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সেদিন তাকে স্বাগত জানায়। এই সোয়েতোতেই সংগ্রামের নেতা হিসেবে অভিষেক হয়েছিল ম্যান্ডেলার।
১৯৬৩ সালে কুখ্যাত রিভোনিয়া ট্রায়ালে হত্যার অভিযোগে বিচারের সময় কাঠগড়ায় ম্যান্ডেলার দেয়া বক্তব্যটি তার রাজনৈতিক জীবন ও দর্শন সম্পর্কে তার সাক্ষ্য বহন করে।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সারা জীবন আমি উত্সর্গ করেছি আফ্রিকার জনগণের জন্য। আমি লড়েছি শ্বেতাঙ্গ শোষণের বিরুদ্ধে, আমি লড়েছি কৃষ্ণাঙ্গ শোষণের বিরুদ্ধেও।’
ম্যান্ডেলার বর্ণাঢ্য জীবন
নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় রাষ্ট্রনায়কদের একজন, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে বহু বর্ণভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, প্রখর রসবোধ, তিক্ততা ভুলে বৈরী প্রতিপক্ষের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মতো উদারতা এবং বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় জীবনকাহিনী মিলিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
বর্ণবাদের অবসানের পর ১৯৯৪ সালের ১০ মে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। এর মাত্র এক দশক আগেও সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গশাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল এক অকল্পনীয় ঘটনা। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন।
তরুণ বিপ্লবী
তরুণ বয়সে নেলসন ম্যান্ডেলা চলে আসেন জোহানেসবার্গে, সেখানে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুব শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে।
একই সঙ্গে তিনি কাজ শুরু করেন একজন আইনজীবী হিসেবেও। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা অলিভার টাম্বোর সঙ্গে মিলে তিনি তার অফিস খোলেন জোহানেসবার্গে।
১৯৬০ সালে শার্পভিলে কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে ৬৯ জন নিহত হলে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আদৌ আর লাভ হবে কিনা সে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এ সময় এক বক্তৃতায় নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, সরকার যখন নিরস্ত্র এবং প্রতিরোধবিহীন মানুষের ওপর পাশবিক আক্রমণ চালাচ্ছে, তখন সরকারের সঙ্গে শান্তি এবং আলোচনার কথা বলা নিষম্ফল।
কারাগার থেকে রাজপ্রাসাদে
ম্যান্ডেলার দল এএনসি সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করলে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নেলসন ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করা হয়। বিচারে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত রুবেন দ্বীপে তার দীর্ঘ কারাজীবন।
কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এএনসির শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ টাউনশিপগুলোতে বর্ণবাদবিরোধী লড়াই অব্যাহত থাকে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান শত শত কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ।
নেলসন ম্যানডেলার মুক্তির জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর কারাভোগের পর ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান।
সেদিন কারাগারের সামনে দেয়া বক্তৃতায় নেলসন ম্যান্ডেলা তার সমর্থকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন সেই কথা, যা তিনি তার বিচারের সময় আদালতে বলেছিলেন।
ম্যান্ডেলা বলেন, এমন এক দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে সব জাতি, সব বর্ণের মানুষ সমান সুযোগ নিয়ে একসঙ্গে থাকতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘এটা এমন এক আদর্শ, যেটির আশায় আমি বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু যদি দরকার হয়, এই আদর্শের জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।’
পুরনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেছনে ফেলে নতুন আফ্রিকা গড়ার কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা অতীতের তিক্ততার প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে তার সাবেক শ্বেতাঙ্গ নিপীড়কদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেন। শুরু হলো এক নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার পথ চলা।
মুক্তির পর দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের সঙ্গে নতুন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয়, যেখানে সব বর্ণ এবং সব জাতির সমানাধিকার থাকবে। এর পথ ধরেই ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা।
রাজনৈতিক জীবনের মতো, নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা। ১৯৪৪ সালে তিনি প্রথম বারের মতো বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার প্রথম স্ত্রী ইভলিন মেস। ইভলিনের ঘরে চার ছেলেমেয়ে জন্ম নেয়ার পর ১৯৫৮ সালে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা উইনি ম্যান্ডেলার সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তটি ছিল তার জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ৮০তম জন্মদিবসে তিনি তৃতীয় বার বিয়ে করেন মোজাম্বিকের সাবেক ফার্স্ট লেডি গ্রাসা মার্শেলকে।
বিশ্বশান্তির প্রতীক
অবসরে যাওয়ার পরও নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যস্ততা থামেনি। স্বাধীনতা এবং বিশ্বশান্তির এক আইকন বা প্রতীকে পরিণত হয়েছেন তিনি। সুতরাং তার ডাক পড়তে থাকে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে।
তার এক ছেলে মারা গিয়েছিলেন এইডসে। এ ঘটনার পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় এইডস প্রতিরোধ এবং এর চিকিত্সা নিয়ে সোচ্চার হন। বাকি জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং এইডস নিরাময়ের লক্ষ্যে প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
নেলসন ম্যান্ডেলাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাকে কীভাবে মনে রাখলে খুশি হবেন তিনি? তার উত্তর ছিল, ‘আমি চাই আমার সম্পর্কে এ রকম কথাই বলা হোক— এখানে এমন এক মানুষ শায়িত আছেন, যিনি পৃথিবীতে তার কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। আমি চাই এটুকুই বলা হোক আমার সম্পর্কে।’
বিশ্বনেতাদের শোক
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা।
ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘একজন মানুষ যা অর্জন করতে পারে ম্যান্ডেলা তার থেকেও বেশি কিছু অর্জন করেছেন। তিনি অন্যদের স্বাধীনতার জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, ‘আজ তিনি চলে গেছেন এবং আমরা হারিয়েছে সবচেয়ে প্রভাবশালী, সাহসী ও সুগভীর ভালো মানুষটিকে।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘পৃথিবীর একটি মহান বাতি নিভে গেছে। ম্যান্ডেলা ছিলেন আমাদের সময়ের হিরো।’
বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটু বলেন, ‘মাদিবা ১৯৯০ সালে যখন জেল থেকে বের হন তখন তিনি ছিলেন মাটির নিচে মহামূল্যবান হীরার মতোই নিখুঁত। তিনি রক্তের বদলা রক্ত নিতে চাননি। এর পরিবর্তে তিনি ক্ষমা ও সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে অসাধারণ মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।’
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, ‘ন্যায়বিচারের মহীরুহ ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি ছিলেন গোটা বিশ্বের জন্য অনুপ্রেরণা।’
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ এবং সারা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠকরা একজন মহান নেতাকে হারিয়েছেন। স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য তার প্রচণ্ড আবেগ সারা বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের জন্য আশার সঞ্চার করেছে। তার কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকা আজ বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশ।’
জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল বলেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলার অহিংস রাজনীতির উত্তরাধিকার এবং সব ধরনের বর্ণবাদের নিন্দা বছরের পর বছর বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।’
বাংলাদেশে নেলসন ম্যান্ডেলা
বিশ্ববরেণ্য এই নেতার আগমন ঘটেছিল বাংলাদেশেও। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উত্সবে অংশ নিতে ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ তিনি ঢাকায় আগমন করেন। সেই সময় আরও এসেছিলেন ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেদা ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেল। তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত শিখা চিরন্তন উদ্বোধন করবেন।
বাংলাদেশের মানুষ তার সেই ঐতিহাসিক সফরকে স্মরণে রেখেছে। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত শোক পালনকালে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
রাষ্ট্রপতির শোক
বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ও বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
গতকাল এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বিশ্ব পরিমণ্ডলে তাকে সুবিশাল ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে বিশ্ব অন্যতম এক প্রভাবশালী ও সাহসী নেতাকে হারালো।
আবদুল হামিদ বলেন, নেলসন ম্যান্ডেলা জনগণের মুক্তি অর্জন ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে নেলসন ম্যান্ডেলার পরিবার ও দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের প্রতি তার গভীর শোক জানান।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও বিংশ শতাব্দীর রাজনীতির বিশাল ব্যক্তিত্ব নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আজ এক শোকবার্তায় ম্যান্ডেলাকে মানবজাতির একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তার মৃত্যুতে শান্তি, স্বাধীনতা ও সাম্যের জন্য নিরলস সংগ্রামী এক জীবনের অবসান হলো।
খালেদা জিয়ার শোক প্রকাশ
ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক মর্যাদা এবং সব মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠায় তিনি অপরিসীম সাহস দেখিয়েছেন। এই সর্বজনীন মূল্যবোধে যারা বিশ্বাস করেন তাদের কাছে তিনি চিরকাল অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবেন। তার মৃত্যুতে বিশ্ব হারিয়েছে এক মহান রাষ্ট্রনায়ককে।
বিবৃতিতে খালেদা জিয়া নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেন।

মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৩

সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় আলোচিত প্রার্থী নদভী

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত শিবিরের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে এবারে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবু রেজা মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন নদভী। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাঈন উদ্দিন হাসান চৌধুরীসহ এক ডজন নেতাকে ডিঙিয়ে আবু রেজা নদভী দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় অবাক হয়েছেন তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মী। তারা বলেছেন, তিনি অতীতে কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর সাথে আবু রেজা নদভীর পরিচয়ও নেই। এমনকি উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতাও তাকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন না। এরপরও নেত্রীর প্রতি সম্মান জানিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন কিছু আওয়ামী লীগ নেতা। আবার কেউ কেউ বলছেন নদভী এক সময় জামায়াতের পক্ষে ভোট চাওয়ায় এখন নৌকার পক্ষে ভোট আদায় করাটা একটু কঠিন হবে। অনেকে দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেউ বলছেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছে নদভী এখন ‘যখন যেমন, তখন তেমন’ নেতা হিসাবে পরিচিত। তবে এলাকায় তিনি ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনেক মসজিদ, মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করেছেন। সে সুবাদে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট লোকজন ছাড়াও অনেক সাধারণ মানুষের সাথে নদভীর সুসম্পর্ক রয়েছে। এদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে তিনি কাজ শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন। আবু রেজা নদভীকে দলের মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। প্রত্যেক ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত সভা-সমাবেশ করে নৌকা প্রতীকের পক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। লোকজন যথেষ্ট সাড়াও দিয়েছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ছাড়াও নেত্রী আমাকে যখন যেখানে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা সঠিক ভাবে পালন করে এলাকার মানুষের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবু রেজা নদভীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। সে বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই। নেত্রীর সিদ্ধান্তকে আমি সব সময় শ্রদ্ধা করি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, আবু রেজা নদভী এক সময় জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে তিনি ভোটও চেয়েছেন। অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। এরপরও নেত্রী যেহেতু তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। নেত্রী বলেছেন প্রার্থী নয়, নৌকা প্রতীকের পক্ষে কাজ করার জন্য।
এ বিষয়ে আবু রেজা নদভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস রেখে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে এ আসনটি নেত্রীকে উপহার দেয়ার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবো। ইতোমধ্যে আমি কাজ শুরু করেছি। নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে সাড়াও পাচ্ছি। অতীতে জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত না থাকলেও অনেক দলের অনেক নেতা-কর্মীর সাথে আমার অত্যন্ত সুসম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আশা করছি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, সমর্থকদের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মানুষের ভোটে আমি এ আসনটি নেত্রীকে উপহার দিতে পারবো।
লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী জানান, অতীতে লোহাগাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে আবু রেজা নদভীর কোন সম্পর্ক ছিলনা। দলের হয়ে তাকে কোন কাজ করতে দেখিনি। আমার সাথে নদভীর ব্যক্তিগত কোন সম্পর্কও নেই। বিগত পাঁচ বছর ধরে আমিনুল ইসলাম আমিন দলের হয়ে অনেক কাজ করেছেন। তার সাথে উপজেলা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক রয়েছে। আমিন মনোনয়ন পেলে কাজ করতে কিছুটা সহজ হতো। তবে নেত্রী আমাদেরকে বলেছেন প্রার্থীর পক্ষে নয়, নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইতে। আমরা নদভীর পক্ষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করবো।
সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ মতলব জানান, নেত্রী নদভীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবো। অতীতে নদভীর জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।
সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাস্টার ফরিদুল আলম জানান, আবু রেজা নদভী অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি এক সময় জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছুই নেই। এখন যেহেতু তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এসেছেন আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। নৌকা প্রতীককে জয়ী করতে আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করবো।
এদিকে জামায়াতের সাথে আবু রেজা নদভীর এখনো সুসম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, আবু রেজা নদভীর পিতা আল বদরের নেতা ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষের এই লোককে মনোনয়ন দেয়ায় আমরা চরমভাবে হতাশ হয়েছি। নদভী এখনো আওয়ামী লীগের সদস্য ফরমও পূরণ করেন নি। ভোটের পরে তিনি আওয়ামী লীগ করবেন কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ রয়েছে। তবে নেত্রী যেহেতু নদভীকে প্রার্থী করেছেন আমরা তার বিপক্ষে ভূমিকা রাখবো না।
লোহাগাড়ার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, আবু রেজা নদভীকে আমি চিনি না। দলের নেতা-কর্মীদের সাথেও তার পরিচয় নেই। তার পক্ষে ভোট আদায় করাটা একটু কঠিন হবে।
সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল মমতাজ চৌধুরী বলেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় অতীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভাল করতে পারেন নি। নদভীর সাথে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষের সুসম্পর্ক রয়েছে। আবু রেজা নদভীকে মনোনয়ন প্রদান করায় আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। নদভী অতীতের প্রার্থীদের চেয়ে ভাল করবেন।From Daily Azadi