শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৪

`gb I wbcxo‡bi c_ ïf nq bv

we‡ivax g‡Zi `j‡K mfv-mgv‡e‡ki AbygwZ bv †`qv

MYZvwš¿K iv‡óª mfv-mgv‡ek Kiv bvMwiK‡`i AwaKvi| evsjv‡`‡ki msweav‡bI mfv-mgv‡e‡ki AwaKvi wbwðZ Kiv n‡q‡Q| Avgiv †`LwQ, †ek K‡qK eQi †_‡K miKvi ivR‰bwZK `j¸‡jv‡K †Kv‡bv hyw³m½Z KviY QvovB mfv-mgv‡ek Ki‡Z w`‡”Q bv| me©‡kl †`‡ki e…nËg ivR‰bwZK `j weGbwc‡K mgv‡ek Kivi AbygwZ †`qv nqwb| RvZxq wecøe I msnwZ w`em Dcj‡¶ `jwU †mvnivIqv`©x D`¨v‡b mgv‡e‡ki AbygwZ †P‡qwQj| wKš‘ cywjk cÖkvmb Zv‡Z AbygwZ †`qwb| †Kb GB AbygwZ †`qv n‡jv bv, †m m¤ú‡K©I wKQy ejv n‡jv bv| GB mgv‡e‡ki †NvlYv weGbwc Av‡MB w`‡qwQj| †m Abyhvqx cÖ¯—ywZI †bqv n‡qwQj|
MZ 5 Rvbyqvwii GKZidv wbe©vP‡b wØZxqev‡ii g‡Zv ¶gZvmxb nIqvi ci †_‡K eZ©gvb miKvi we‡ivax ivR‰bwZK `j¸‡jvi Ici Zyjbvg~jK Av‡iv †ewk gvÎvq LoMn¯— n‡q‡Q| cÖwZw`b wewfbœ GjvKv †_‡K kZ kZ we‡ivax ivR‰bwZK `‡ji †bZvKg©x‡K †MÖdZvi Kiv n‡”Q| Gi g‡a¨ mfv mgv‡e‡ki AwaKviI niY Kiv n‡q‡Q| G miKvi m¤¢eZ we‡ivax ivR‰bwZK `j¸‡jv `gbcxo‡bi gva¨‡g ¶gZv `xN©¯’vqx Ki‡Z PvB‡Q| miKv‡ii cÖwZ MÖnY‡hvM¨ wbe©vPb Av‡qvR‡bi me©m¤§Z Dcvq †ei Kivi Rb¨ msjv‡c emvi Dch©ycwi Avn&ev‡b miKvi c‡¶i mvov bv †c‡q B‡Zvg‡a¨ we‡ivax ivR‰bwZK `j¸‡jvi c¶ †_‡K bZyb wbe©vP‡bi Rb¨ Av‡›`vjb ïi“ Kivi ûgwK †`qv n‡q‡Q| Aci w`‡K Avš—R©vwZK gnj †_‡K miKv‡ii Ici mevi AskMÖnYg~jK Av‡iKwU wbe©vP‡bi Rb¨ ZvwM` †`qv n‡q‡Q| gvwK©b hy³ivóª I BD‡ivcxq †`k¸‡jv ¯úó K‡i Rvwb‡q w`‡q‡Q 5 Rvbyqvwii wbe©vP‡bi e¨vcv‡i Zv‡`i Ae¯’v‡bi †Kv‡bv cwieZ©b nqwb| Zv‡`i g‡Z †mwU †Kv‡bv we‡ePbvqB GKwU MÖnY‡hvM¨ wbe©vPb wQj bv|
cÖavbgš¿xmn miKv‡ii gš¿xiv ej‡Qb Zviv mvsweavwbK cÖwµqvq MYZvwš¿Kfv‡e wbe©vwPZ miKvi| wKš‘ miKv‡ii AvPi‡Y †Kv‡bv MYZvwš¿K g~j¨‡ev‡ai cwiPq cvIqv hv‡”Q bv| eis `gb-cxob I †Rje›`x K‡i ivRbxwZ wbqš¿‡Yi †Póv Kiv n‡”Q| GLb mfv-mgv‡e‡ki AbygwZ †`qv n‡”Q bv| Ggb cwiw¯’wZ‡Z we‡ivax ivR‰bwZK `j¸‡jv †kl ch©š— Avev‡iv niZvj-Ae‡iv‡ai g‡Zv Kg©m~wPi w`‡K hv‡e e‡jB g‡b nq| G‡Z †`‡ki cwiw¯’wZ Av‡iv Aw¯’wZkxj n‡q DV‡e| wKš‘ miKvi GK¸u‡qwg Aej¤^b K‡iB P‡j‡Q| ZvB ivR‰bwZK AwaKvi wbwðZ K‡i kvwš—c~Y©fv‡e ivR‰bwZK m¼U wbim‡b miKvi Av‡`Š Avš—wiK wK bv, Zv wb‡q GLb cÖkœ m…wó n‡q‡Q|
Avgiv g‡b Kwi, †`‡k †h ivR‰bwZK m¼U weivR Ki‡Q Zv Aemv‡b me ivR‰bwZK `‡ji mv‡_ miKv‡ii Av‡jvPbv ïi“ Kiv `iKvi| GKB mv‡_ mfv-mgv‡e‡ki g‡Zv Kg©m~wP cvj‡b †Kv‡bv ai‡bi wewawb‡la Av‡ivc Kiv DwPZ n‡e bv| ¶gZvmxb `‡ji `xN© ivR‰bwZK AwfÁZv i‡q‡Q| AZx‡Z †h kvm‡Kiv we‡ivax ivR‰bwZK `‡ji Ici wbcxob-wbh©vZb Pvwj‡q ¶gZv `xN©¯’vqx Kivi †Póv K‡i‡Q †kl ch©š— Zviv e¨_© n‡q‡Q| wbcxob ev ivRbxwZ wbqš¿‡Yi c_ fyj c_| Avgiv Avkv Kie, miKvi AZxZ †_‡K wk¶v wb‡q †`‡k MYZvwš¿K cwi‡ek wdwi‡q Avbvi D‡`¨vM †b‡e|

সোমবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৪

মালয়েশিয়ার বিমানে যৌন হয়রানি!



মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বিমানের চিফ স্টুয়ার্ডের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন একজন নারী যাত্রী।

আজ সোমবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে যাওয়ার পথে যৌন হয়রানির ঘটনাটি ঘটে বলে ওই নারী অভিযোগ করেন।

গতকাল রোববার অস্ট্রেলিয়ার চ্যানেল সেভেনের কাছে ২৬ বছর বয়সী লরা বুশনি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের বিমানে চড়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিমানটির চিফ স্টুয়ার্ড (প্রধান পরিচারক) তাঁর পাশে বসেন। একপর্যায়ে তাঁর পায়ে হাত বোলাতে থাকেন। পরে তিনি তাঁর প্যান্টের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেন।

ঘটনার পর ওই বিমানকর্মী দাবি করেন, তাঁর উদ্দেশ্য ভালো ছিল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে না জানাতে বুশনির কাছে অনুরোধ করেন এবং ক্ষমাও চান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস।

বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০১৪

সাব্বাশ হামাস!! সাব্বাশ ফিলিস্তিন!!-ফরহাদ মজহার

এক.
এ লেখা যখন লিখছি তখন গাজায় নয়দিনে ইসরাইলের বোমা হামলায় কমপক্ষে ২২৬ জন মারা গিয়েছে, আহত হয়েছে ১৬৮৫। এদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শিশু ও নারী। সারে সারে কফিন দিয়ে মোড়ানো শিশুদের লাশ সারা দুনিয়ায় মানুষের বিবেককে আহত ও সংবেদনা জাগ্রত করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। মানুষ নিন্দা জানাচ্ছে নানান ভাবে। বাংলাদেশ ব্যতিক্রম নয়।

কিন্তু ‘গাজায় হত্যা বন্ধ কর’, ‘শিশু হত্যা বন্ধ কর’, ‘Stop Killing in Gaza’, ‘Stop Killing Children’, এইসব প্লাকার্ড হাতে বাংলাদেশে এবং বিভিন্ন দেশে ভদ্রলোকী শ্লোগান দিয়ে শহরের নিরাপদ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে হাজার চেঁচামেচি করলেও ইসরাইল বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করবে না, করছে না, এবং তাদের বোমা মারাও থামবে না। অতীতেও ইসরাইল তোয়াক্কা করে নি, এখনও করবে না। আজকের খবর হচ্ছে সাময়িক যুদ্ধ বিরতিতে দুই পই সম্মত হয়েছে। কিন্তু সেটা সাময়িক। যুদ্ধ শুরুর আগে ফিলিস্তিনে যে অবস্থা থাকে তাকে এক হিসাবে লম্বা যুদ্ধবিরতি বলা চলে। এই বাস্তবতা মনে রেখেই ফিলিস্তিনের আলোচনা করতে হবে।

ফিলিস্তিন ও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে তাকে সরলীকরণ করে বোঝার চেষ্টা বোকামি। কিন্তু সাধ্য মতো চেষ্টা করা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর কোন প্রকট প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে না ঘটলেও তার প্রভাব গভীর। বাংলাদেশ বিশ্বসভা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। বাংলাদেশের আগামি দিনের রাজনীতি নানা ভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর দ্বারা প্রভাবিত হবে। আগামি আলোচনার সূত্র হিসাবে আজ শুধু কিছু বিষয় উত্থাপন করে রাখব। গাজায় ইসরাইলী হামলার যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তাদের প্রতি সংহতি জানানোই মূল উদ্দেশ্য। সেটা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি আমাদের একাত্মতার জায়গাটুকু খানিক সাফ করে রাখবার চেষ্টা করব।

এটা পরিষ্কার যারা প্লাকার্ড হাতে প্রতিবাদ করছেন তারা তাঁদের ব্যক্তিগত বিবেকের তাড়া থেকে করছেন। ব্যক্তির দায়বোধ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে এর বেশী কিছু করার আছে কিনা সেটা এই দায়বোধে রাস্তায় প্লাকার্ড ও ব্যানার হাতে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে ভাববার একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটাও কম নয়। নিদেন পক্ষে  ফিলিস্তিন নিয়ে আমাদের আরো গভীর ভাবে ভাববার উৎসাহ বাড়বে।

তবে জেনে হোক বা না জেনে হোক, যখন আমরা শুধু শান্তি, অস্ত্র বিরতি, ও সদর্থে হত্যার নিন্দা করি, তখন আমরা ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সংগ্রামের বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত সশস্ত্র যুদ্ধকে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করার শর্ত তৈরি করি। শান্তি, অহিংসা ও যুদ্ধ বিরতির কথা বলে বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেও অনেক ভদ্রলোকী বয়ান ছিল। তাদের কথা শুনলে আমরা আজও পাকিস্তানের উপনিবেশ থাকতাম। ইসরাইলের বোমা হামলা ও হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করলেও, হামাসসহ ফিলিস্তিনীদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমরা নীরব। অথচ দরকার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একাত্মতা জানানো। সেই যুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের সম্পর্কে আমাদের অনেক ভুল ধারণা আছে। পাশ্চাত্য প্রচার প্রপাগান্ডার শিকার হয়ে আছি অনেকেই। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। আপাতত মনে রাখা দরকার হামাস গাজায় গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। দুই হাজার সাত সাল থেকেই হামাস গাজার নির্বাচিত প্রতিনিধি। ফিলিস্তিন পার্লামেন্টে ২০০৬ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে হামাস আল ফাতাহকে পরাজিত করে। সেই থেকে তারাই কর্তৃত্বের আসনে আছেন।

এ কারণে ইসরাইল ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষক রাষ্ট্রগুলোর মানদণ্ড দিয়ে হামাসকে বিচার করা যাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জর্দান ও ইউরোপের অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র ছাড়া হামাসকে নেতিবাচক ভাবে অন্য কেউ দেখে না। তাদের মধ্যে চিন, রাশিয়া, তুরস্ক ছাড়াও অনেক আরব দেশ রয়েছে। ফিলিস্তিনী জনগণ কিভাবে কাদের নেতৃত্বে তাদের ন্যায়সঙ্গত লড়াই চালিয়ে যাবে সেটা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তারপরও হামাসের সমালোচনা হতে পারে। অবশ্যই। কিন্তু যারা ইসরাইলের নিন্দা করছেন তারাই আবার ইসরাইলী প্রপাগান্ডার কারণে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন বলছেন। তারা আসলে গাজার ফিলিস্তিনীদেরই মূলত সন্ত্রাসী বলছেন, কারণ এই ফিলিস্তিনীরাই হামাসকে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হিসাবে মেনে নিয়েছে। ফিলিস্তিনীরা জাতিগত ভাবেই ‘সন্ত্রাসী’ সেটা ইসরাইলের প্রচার। হামাসকে সন্ত্রাসী বলা মানে ইসরাইলী প্রচারে সায় দেওয়া। সেই প্রচারে সায় দিয়ে গাজায় বোমা হামলা ও শিশু হত্যার নিন্দা তামাশা হয়ে যায়। যারা মরছে তারা তো ইসরাইলের যুক্তি অনুসারে ‘সন্ত্রাসী’ আর ইসরাইল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত বোমা হামলা চালাচ্ছে। স্ববিরোধী অবস্থান নিয়ে গাজার হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ঠিক কিনা সেটা সবাইকে ভেবে দেখতে বলব।

আসলে এ লড়াইকে জায়নবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুগের ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’ হিশাবে বুঝতে না পারলে আমরা মারাত্মক ভুল করব। বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতাও আমরা ধরতে পারব না।

আমরা উপনিবেশ সম্পর্কে জানি। কারণ আমরা ইংরেজের অধীনে ছিলাম। ইংরেজ আমাদের রাজনৈতিক ভাবে পরাধীন করেছিল সম্পদের লোভে। সেটা স্রেফ লুণ্ঠন যেমন তেমনি আইন করে জমি থেকে খাজনা পাওয়া থেকে শুরু করে, এই উপমহাদেশকে তাদের পণ্যের বাজারে পরিণত করা ইত্যাদি ছিল সেই উপনিবেশের কিছু দিক। আমাদের শ্রম শক্তিও তারা শোষণ করেছে। সাম্রাজ্যবাদের এই রূপটা আমাদের চেনা। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপের সাদা মানুষেরা গিয়ে যখন পুরা মহাদেশ তাদের দখলে নিয়ে নিল, তখন তারা ইংরেজের মতো শুধু ঔপনিবেশিক সম্পর্কের ভিত্তিতে শোষণ করে নি। সেই মহাদেশের আদি অধিবাসীদের অধিকাংশকেই তারা নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। বহু জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এখনও যারা বেঁচে আছে তাদেরকে তারা তাদের নির্দিষ্ট জায়গাতে বন্দিশালার মতো ‘রিজার্ভ’ বানিয়ে অদৃশ্য করে রেখেছে। সেইসব দেশে ইউরোপীয়রা শুধু ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে নি, দেশ দখল করে নিয়ে নিজেরাই সেখানে বস্তি গেড়ে বসেছে। পুরা মহাদেশ তাদের দখলে নিয়ে নিয়েছে তারা। যেসব জাতি ধ্বংস ও বিলুপ্ত হয়েছে তাদের কথা আমরা খুব একটা শুনি না। যারা এখনও ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে সেই জাতিগুলো বিলুপ্তির পথে।

এই যে স্থানীয় অধিবাসীদের উৎখাত ও হত্যা করা এবং করতে না পারলে রিজার্ভে রেখে দেওয়া আর পুরা দেশ, মহাদেশ বা ভূখণ্ড দখল করে নেওয়া একেই বলা হয় ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’। এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা আছে। পাঠকদের জন্য আপাতত এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট। উপনিবেশ স্থাপন করে বিলাতে বসে শোষণ লুণ্ঠন আর স্থানীয় অধিবাসীদের উৎখাত করে নিজেরা বসতি স্থাপন করার উপনিবেশ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। আমাদের অভিজ্ঞতায় সেটা নাই বলে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’-এর ভয়াবহতা আমরা বুঝতে পারি না। যে কারণে ফিলিস্তিনীদের লড়াইয়ের মর্ম বুঝতেও আমরা অধিকাংশই অক্ষম। ইহুদিদের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে অতি দরদী হয়ে যারা ইসরাইলের পাবলম্বন করার অর্থ সেটলার কলোনিয়ালিজমের পক্ষে বলা। এই ধরনের উপনিবেশীকরণের যারা শিকার তারা যখন সেই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে জানপরান লড়ে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য আমরা বুঝি না। বুঝি না বলেই তাদের ন্যায়যুদ্ধকে অতি অনায়াসে ‘সন্ত্রাস’ বলতে আমাদের বাঁধে না।

ইউরোপ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা যখন পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় ফিলিস্তিনীদের ভূমি দখল করে নিল আর সেটাকেই তাদের ভূখণ্ড দাবি করে ফিলিস্তিনীদের তাড়িয়ে দিল সেটা অবশ্য নতুন ধরনের সেটলার কলোনিয়ালিজম। কারণ সেটা সম্ভব হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রত্য সহায়তায়। অতীতের সেটলার কলোনিয়ালিজমের সঙ্গে এখানে তার পার্থক্য আছে। ফিলিস্তিনীদের তাহলে শুধু ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়লে হচ্ছে না, সেটলার কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়ে উঠেছে। এ এক অসম ও অসম্ভব যুদ্ধ। আর সে কারণেই অতীতের যে কোন গণযুদ্ধের চেয়ে ফিলিস্তিনীদের লড়াই মানবেতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও দুনিয়ার সকল মানুষের ঐতিহাসিক অভিমুখ নতুন করে নির্ণয়ের লড়াই।

এরপর রয়েছে জায়নিজম (zionism) বা জায়নবাদ। প্রথমত বুঝতে হবে জায়নবাদ হচ্ছে ইহুদি জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ থেকে সে আলাদা কিছু না। জায়নবাদীরাও তাদের সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামই বলে। ইউরোপে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত ইহুদিদের পক্ষে দাঁড়ানো ও তাদের অধিকারের জন্য লড়াই সে কারণে ন্যায্য। কিন্তু নিপীড়িত জনগোষ্ঠির পক্ষে দাঁড়ানো আর জায়নবাদের পক্ষে দাঁড়ানো এক কথা নয়।

জাতীয়তাবাদ তার আত্মপরিচয়কে ভূমিসংশ্লিষ্ট দেখে। মাতৃভূমি জাতীয়তাবাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরাও সেই অনুপ্রেরণায় নিজেদের জন্য একটি বাসভূমি (homeland) বা দেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু ইহুদিরা দীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করছে। নিজ বাসভূমির বাস্তবায়নের কথা ভাবতে গিয়ে তারা দাবি করতে শুরু করে এক কালে বহু হাজার বছর আগে তারা প্যালেস্টাইনে বাস করত। অতএব প্যালেস্টাইনের ভূখণ্ডের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। এই দাবিতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সহযোগিতায় তারা ফিলিস্তিন দখল করে সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। আধুনিক কালের জাতীয়তাবাদী যুগেই ইহুদি জাতীয়তাবাদ বা জায়নবাদের উদ্ভব, বিকাশ ও শক্তিবৃদ্ধি।

জায়নবাদ কথাটা আমরা শুনি, কিন্তু অধিকাংশই বুঝি না ব্যাপারটা আসলে কী। অন্যের ভূখণ্ড দখল করা ও সেই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসীদের বিতাড়িত করবার পক্ষে যুক্তি লাগে। তো জাতিবাদী ইহুদিরা দাবি করে তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী আল্লাহর সঙ্গে তাদের একটা চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের একটি ভূখণ্ড আল্লাহ শুধু তাদের জন্যই বরাদ্দ করেছেন। সেটাই ইসরায়েল। তো এই ভূখণ্ডে তাদের বসতি স্থাপন ও একটি আধুনিক রাষ্ট্র বানাতে দিতে হবে। সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় তারা তাই করেছে।

জায়নবাদীরা এটাও দাবি করে বনী-ইস্রাইল বা ইহুদিরা বিশেষ একটি ‘জাতি’ এবং এই জাতিকে আল্লাহ ‘বিশেষভাবে মনোনীত’ করেছেন। আল্লাহ তাদের বিনা শর্তে ইহকালে এবং পরকালের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অন্য যে কোন জাতির চেয়ে তারা শ্রেষ্ঠ এবং অন্যান্য জাতি তাদের তুলনায় হীন। ফলে, অন্যসকল মানুষের চেয়ে তাদের মর্যাদা আলাদা। পাপ-পুণ্যের হিসাবও তাদের জন্য আলাদা। ইহুদিরা ছাড়া অন্য কেউই আল্লাহর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধু জন্মসূত্রে ইহুদি হবার কারণেই তারা যা কিছুই করুক না কেন পরকালের সকল পুরষ্কার শুধু তাদেরই প্রাপ্য। তারা সুদ খাক, পাপ করুক কিম্বা অন্যের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করুক তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর শাস্তির বিধানও আলাদা।

বলাবাহুল্য, আল্লাহর সঙ্গে কোন জাতির এরকম চুক্তি হয়েছে, কিম্বা আল্লাহ কোন বিশেষ জাতিকে অন্য সকল মানুষকে বাদ দিয়ে বিশেষ কোন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন  এটা ধর্মতত্ত্ব হিসাবে থাকতেই পারে। তার ভাল মন্দ বিচারও ভিন্ন বিষয়। তাছাড়া একই কথার ভিন্ন মানে বা ভিন্ন ব্যাখ্যাও হতে পারে। আর এমন অনেক গোঁড়া ইহুদিও আছেন যারা জাতীয়তাবাদী বা জায়নবাদী ইহুদির সঙ্গে মোটেও একমত নন। হজরত মুসার অনুসারী হওয়া আর জাতীয়তাবাদী ইহুদি হওয়া এক কথা নয়। মুশকিল হচ্ছে এ চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প হিসাবে জায়নবাদীরা আরব ভূখণ্ডে বাস্তবায়িত করেছে। ফলে এক দুঃসহ নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। ইসরাইল সেই পরিস্থিতিকে বারবারই অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে। 

তাহলে বুঝতে হবে জায়নবাদ আর জাতীয়তাবাদ একই কথা  সেটা বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হোক কিম্বা হোক মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য যে কোন নামের জাতীয়তাবাদ। বাঙালি বা বাংলাদেশী বলে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চিরকালীন ও অবিচ্ছেদ্য  এই মতাদর্শ জায়নবাদ থেকে আলাদা কিছু নয়। আধুনিক ও তথাকথিত সেকুলার কালে জায়নবাদে জাতীয়তাবাদের এই ধর্মীয় রূপটাই আমরা প্রত্যক্ষ করি। পার্থক্য হচ্ছে জায়নবাদ দাবি করে, আল্লাহর সঙ্গে ইহুদি জাতির একটা ‘চুক্তি’ হয়েছে, অতএব ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতিসত্তার পূর্ণ বিকাশের জন্য ইহুদিদের নিয়ে একটি ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করতেই হবে, এর বিরুদ্ধে কোন ইহলৌকিক বা সেকুলার যুক্তি খাটবে না। অন্য কোন ধর্মের যুক্তিও খাটবে না। আমরা ধর্মের যুক্তি দেই না। কিন্তু বলি যে আমরা বাঙালি জাতি। অতএব বাঙালি জাতি হিসাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আমাদেরই একমাত্র অধিকার। জাতি হিসাবে আমাদের একটি জাতিবাদী রাষ্ট্র দরকার  এর গায়ে ধর্মের পোশাক না থাকলেও জাতীয়তাবাদের জোর ধর্ম বিশ্বাসের মতোই।

ধর্মগ্রন্থের কাহিনী অনুযায়ী ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে যারা দাঁড়ান, তারা মূলত জায়নবাদেরই সমর্থক। জায়নবাদের যুক্তি মেনে নিলে হিন্দুর জন্য একটি হিন্দু রাষ্ট্র, মুসলমানদের জন্য মুসলমান বা ইসলামি রাষ্ট্র, খ্রিস্টানদের জন্য খ্রিস্টান রাষ্ট্র, বৌদ্ধদের জন্য বৌদ্ধ রাষ্ট্র এই সবের পক্ষে একই সঙ্গে দাঁড়ানো হয়। মুখে বলি আর না বলি, ধর্মগ্রন্থে থাকুক বা না থাকুক, জায়নবাদ অন্য সকল ধর্মের জায়নবাদী দাবিকেই ন্যায্য করে তোলে। একই সঙ্গে একটি ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি জাতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের জাতীয়তাবাদী বয়ানকেও বটে।

আরো নানান কারণ ছাড়াও জাতীয়তাবাদ ভয়াবহ জিনিস। এর মধ্যে কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদ হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্রের। সশস্ত্র হোক কি নিরস্ত্র কমিউনিস্ট যে কোন নিপীড়িত জাতীর মুক্তি সংগ্রামকে নিঃশর্ত সমর্থন করে, কিন্তু কোন প্রকার কাল্পনিক ‘জাতি’ বা ‘জাতীয়তাবাদ’কে প্রশ্রয় দেয় না। বিভিন্ন দেশে কমিউনিজমের বারোটা বাজাবার ক্ষেত্রে এদের অবদান অসামান্যই বলতে হবে।

দুই.
চল্লিশ দশকের শেষ দিকে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবশিষ্ট গুলোর পরিসমাপ্তি ঘটতে শুরু করে। আমাদের এ অঞ্চলে সাতচল্লিশ সালে ইংরেজ শাসনের অবসান যেমন। কিন্তু আশ্চর্য যে একই সময়ে সাম্রাজ্যবাদ নতুন কিসিমের উপনিবেশ বানাতে শুরু করে। নতুন ধরনের ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’। তারা ইউরোপ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিতাড়িত করে তাদের জন্য আরব ভূখণ্ডে জবরদস্তি চিরস্থায়ী আবাস বানিয়ে তাকে রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়। আর সেটা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনীদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়, তারা দেশান্তরী হয়। বিভিন্ন জায়গায় তাদের আশ্রয় হয় শরণার্থী শিবিরে। এই অপরাধকে ন্যায্যতা দেবার জন্য বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের নির্যাতন ও গণহারে মারাকে (holocaust) অজুহাত হিসাবে খাড়া করা হয়েছে। সাদা মানুষগুলো এর আগে ইউরোপ থেকে গিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি মহাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। সেই মহাদেশের আদি অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে মহাদেশগুলো দখল করে নিয়েছে তারা। যাদের হত্যা করতে পারে নি তাদের এখনও রেখে দিয়েছে রিজার্ভে। আফ্রিকা মহাদেশের অনেককে দাস বানিয়েছে তারা। আমেরিকান ইন্ডিয়ান, মায়া, ইনকা ইত্যাদি সভ্যতাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে তারা। সে ইতিহাস বড়ই নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস। সেই সকল হোলোকস্টের কথা ভুলে গিয়ে আজ সাম্রাজ্যবাদ শুধু ইউরোপের হোলোকস্টের কথা বলে। শুধু তাই নয়। সকল প্রকার মারণাস্ত্রে জায়নবাদী ইসরাইলকে সজ্জিত করেছে তারাই। সকল প্রকার আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে ফিলিস্তিনীদের নিজ জন্মভূমি থেকে তারা উৎখাতই শুধু করে নি, নির্মম ভাবে হত্যা করছে বছরের পর বছর। আরব দেশগুলোতে টিকিয়ে রেখেছে তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠী। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনীরা তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা চর্চার (anti-semitism) পরিণতি হিসাবে তাদের নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আবার সেই ইহুদি নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাকেই সাম্রাজ্যবাদ মহিয়ান করতে চায় কেন? কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের স্বার্থ রা করার পেছনে তাদের জ্বালানি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত সন্দেহ নাই, কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে তাদের অতীতের জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধ লুকিয়ে রাখার মতলব। যেন ইহুদি হোলকস্টের কাহিনী দিয়ে উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকায় সংঘটিত অন্যান্য হোলকস্টের কথা ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ইউরোপের এই সাদা মানুষগুলোই কি আদিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করে নি? জনগোষ্ঠির পর জনগোষ্ঠিকে কি নিশ্চিহ্ন করে দেয় নি? এই কিছুদিন আগেও কালোদের দড়িতে কি লটকিয়ে মারে নি তারা? পুড়িয়ে হত্যা করে নি? সেই সকল হোলকস্টের কী হোল? তাহলে আমাদের পরিষ্কার বুঝতে হবে দুনিয়ায় ইহুদিরাই একমাত্র নির্যাতীত জাতি নয়, অন্যান্য নির্যাতীত জাতিকে যেভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে তাদের ইতিহাস কি আমরা কি মনে রেখেছি? ইহুদিদের ওপর নির্যাতন নিন্দনীয়। কিন্তু ইহুদি নির্যাতনের কাহিনী দিয়ে মানবেতিহাসের অন্য সকল নির্যাতনকে গৌণ ও অদৃশ্য করে ফেলা মহা অপরাধ।

আমরা ইতিহাস ভুলে যাই। ভুলে যাই তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ বা পাশ্চাত্য সভ্যতার ইঁটপাথরগুলো তৈরি হয়েছে সেইসব মানুষের হাড় দিয়ে যাদের গায়ের রঙ ছিল কালো, বাদামি বা অন্য রঙের। বর্ণবাদ আমাদের নিজেদের কলিজাকে কয়লার কালিতে কালো করে ফেলেছে। তাই যারা ইহুদিদের রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে দাঁড়িয়ে আজ ফিলিস্তিনী জনগণকে সেই রাষ্ট্র মেনে নেবার কথা বলেন, তারা জায়নবাদের পক্ষেই শুধু দাঁড়ান না, একই সঙ্গে তারা বর্ণবাদের পক্ষেও বটে। ফিলিস্তিনী জনগণের সংগ্রাম এই দুইয়েরই বিরুদ্ধে।

অন্য জনগোষ্ঠি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, কিম্বা ধুঁকছে তাদের জন্য বরাদ্দ ‘রিজার্ভ’ গুলোতে। কিন্তু ফিলিস্তিনীরা দমে নি। গাজাকে কুখ্যাত প্রিজন হাউস বানাবার পরেও লড়ছে তারা। এই জন্যই আমাদের বলতে হবে, সাবাশ হামাস! গাজা থেকে প্রতিটি রকেট ছোঁড়ার অর্থ সেই সব হোলকস্টের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আমেরিকান ইন্ডিয়ান, মায়া, ইনকা, দাস হিসাবে ধরে নিয়ে যাওয়া আমেরিকায় আফ্রিকার কালো মানুষসহ আরো অগুনতি মানুষ যাদের ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদ মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর।

আমাদের বলতে হবে, সাবাশ ফিলিস্তিন! সাম্রাজ্যবাদী যুগে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে তোমাদের লড়াই। সাম্রাজ্যবাদের হৃদপিণ্ড এখানেই। এর বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া জাতীয়তাবাদ, জায়নবাদ ও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিলয় ঘটিয়ে দুনিয়ার সকল মানুষের ঐক্য কায়েমের জন্য শর্ত তৈরি অসম্ভব। অন্য কোন শর্টকাট রাস্তা নাই।

দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী ও জায়নবাদী বহুত আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে তারাই নিকৃষ্ট যারা প্রগতির ভান ধরে। জায়নবাদের সবচেয়ে চরম বিকার এদের মধ্যেই আপাদমস্তক দৃশ্যমান হয়। নিজেদের পোষা মতাদর্শের সঙ্গে মিলে না বলে এরাই নিপীড়িত জনগোষ্ঠির ন্যায্য যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়ায়।

এই যুগ ভণ্ড, কাপুরুষ, নিপীড়ক ও জালিম বিশ্বব্যবস্থার ধ্বজাধারীদের যুগ নয়। এই যুগ সৎ, পরিচ্ছন্ন ও সাহসীদের যুগ। যারা কোনপ্রকার দোদুল্যমানতা ছাড়া হুংকার দিয়ে বলতে পারে সাবাশ ফিলিস্তিন। সাবাশ হামাস, সাবাশ দুনিয়ার যে যেখানে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে লড়ছে। লড়বে।

আবারও বলি সাবাশ ফিলিস্তিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তোমরা আমাদের পাশে ছিলে, সকল জাতীয়তাবাদী ও জায়নবাদী সংকীর্ণতা ছিন্ন করে বাংলাদেশের বীর ছেলেরা তোমাদের জন্য রক্ত দিয়েছে, শহিদ হয়েছে। আমরা তোমাদের পাশে আছি। থাকব।

১৭ জুলাই ২০১৪। ২ শ্রাবণ ১৪২১। শ্যামলী।
farhadmazhar@hotmail.com

সোমবার, ২৩ জুন, ২০১৪

জিয়া বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও মুজিব ব্যর্থ পলিটিশিয়ান

ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল ২০১৪ টুর্নামেন্টের ওপেনিং ম্যাচে সাও পাওলোতে ব্রাজিল একটি বিতর্কিত পেনালটির সাহায্যে ৩-১ গোলে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। ইতিপূর্বে ব্রাজিল পাচবার চ্যাম্পিয়ন হলেও অনেকের মতে এই ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ছিল অনাকর্ষনীয়। তারা বলেন, এভাবে খেললে ব্রাজিল এবার চ্যাম্পিয়ন হবে না। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনে গত ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন স্পেনও একটি বিতর্কিত পেনালটির মাধ্যমে হল্যান্ডের বিরুদ্ধে এগিয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল্যান্ড ৫-১ গোলে বিজয়ী হয়। অনেকের মতে হল্যান্ড এই ম্যাচে আরো তিনটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেছে। স্পেনের এই শোচনীয় পরাজয় এবং হল্যান্ডের দুর্দান্ত নৈপুন্য ওয়ার্ল্ড কাপে প্রতিযোগী বাদবাকি ৩০টি দেশের কাছে অশনি সংকেত পাঠিয়েছে। এখন বিশ্ব জুড়ে ফুটবল প্রেমীদের মনে একটা প্রশ্ন, দুই ফেভারিটের (ইংরেজি শব্দ ঋধাড়ঁৎরঃব-এর উচ্চারন ও বাংলা বানান ফেভারিট - ফেবারিট নয়) যদি এই অপ্রত্যাশিত দুর্বল অবস্থান হয়, তাহলে এবার ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন কোন দেশটি হবে? এই একটি প্রশ্ন যখন স্টেডিয়াম থেকে ফাস্ট ফুড শপে এবং বাড়ি থেকে অফিসে, সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তখন ব্রাজিল থেকে প্রায় দশ হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে রাজনীতি প্রেমীদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে অন্য আরেকটি প্রশ্ন।
সেটি হলো কেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে, বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান, বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত ও চিকিৎসাধীন তারেক রহমান গত মার্চ থেকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মকান্ডের মুল্যায়ন করে চলেছেন?
কেন? কেন? কেন?
রাউন্ড ওয়ান
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পুর্ব লন্ডনের রয়াল রিজেন্সি মিলনায়তনে মঙ্গলবার ১৮ মার্চ ২০১৪-তে “বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় ৮ মার্চ ১৯৭১-এর দৈনিক ইত্তেফকের সংবাদ শিরোনাম উদ্ধৃত করে তারেক রহমান বলেন, “৭ মার্চের ভাষণে ছয় দফা বাস্তবায়নের জন্য হরতাল আহ্বানের কোনো ঘোষনা ছিল না। ... ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল পরে এপৃলে। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। এই স্বাধীনতার ঘোষণাটি তিনি নিজের হাতে লিখেছিলেন। ... শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ... শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করেন।”
তারেক রহমানের এই ভাষনের পরে বাংলাদেশে আওয়ামী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। আওয়ামী স্পোকসপারসন রূপ যারা পরিচিত তারা তাৎক্ষনিকভাবে, মুর্খ, আহাম্মক, অর্বাচীন বালক, বেয়াদব, প্রভৃতি বিশেষনে তারেককে ভূষিত করেন। এই পর্যায়ে শেখ হাসিনা কোনো মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন।
রাউন্ড টু
এই প্রতিক্রিয়ার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই জিয়াউর রহমানের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডনের উপকন্ঠে ইলফোর্ডে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বুধবার ২৮ মে ২০১৪-তো তারেক বলেন, “শেখ মুজিব ৩০ বছর রাজনীতি করার পরেও রাজনীতিক হিসেবে ছিলেন ব্যর্থ। অন্য দিকে জিয়া সেনাবাহিনী থেকে রাজনীতিতে এসে মাত্র পাচ বছর রাজনীতি করে সফল রাজনীতিক ছিলেন।... শেখ মুজিব (১) গণতন্ত্রের কথা বলে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে এক দলীয় শাসন চালু করেছিলেন (২) জনগণের নিরাপত্তা বিধানের কথা বলে গুম-খুনের বিস্তার ঘটিয়ে এবং বিরোধী দল দমনের জন্য রক্ষীবাহিনী গঠন করে আতঙ্কের জনপদ তৈরি করেছিলেন এবং (৩) অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বলে দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছিলেন। ... জিয়া দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং অর্থনীতিকে দৃঢ় বুনিয়াদের ওপর দাড় করান।”
লক্ষনীয় যে তারেক এক দিকে শেখ মুজিবের নিন্দনীয় দুর্বলতা, ত্রুটি ও ব্যর্থতাগুলো বলার পাশাপাশি অন্য দিকে জিয়ার প্রশংসনীয় সাহসিকতা, গুনাবলি ও সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।
তারেকের এই দ্বিতীয় ভাষণের পর আওয়ামী মহলে প্রতিক্রিয়া আরো তীব্র হয়। আওয়ামী নিয়ন্ত্রিত দেশের টিভি মিডিয়াগুলোতে ক্রুদ্ধ স্বরে আওয়ামী অভিভাবকরা বিরতিহীন বক্তব্য রাখতে থাকেন। মানসিক ভারসাম্যহীন, উম্মাদ, পাগল, বাচাল, প্রভৃতি আরো কিছু নতুন বিশেষন তারা প্রয়োগ করেন তারেক রহমানের নামের আগে। কিন্তু তারা কেউই আগেও যেমন তারেকের তথ্য ও যুক্তি খন্ডন করার সামান্য চেষ্টা করেননি - এবারও তারা তাদের প্রতিক্রিয়া তারেককে গালিগালাজের মধ্যেই আবদ্ধ রাখেন।
এই পর্যায়ে আরেক প্রয়াত রাষ্ট্রপতির সন্তান শেখ হাসিনা ড্যামেজ কনট্রোল ও লিমিটেশনের জন্য বিতর্কে যোগ দেন।
সোমবার ২ জুন ২০১৪-তে গণভবনে আওয়ামী লীগের যৌথসভার সূচনা বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, “জিয়াউর রহমান মরে গিয়ে বেচে গিয়েছেন। নতুবা ওকেও (জিয়াকে) বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি করতাম। ... বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাক। আর মোশতাকের পছন্দ ছিল জিয়া। ... হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিল জিয়া।”
লক্ষনীয় যে আওয়ামী নেতা ও অভিভাবকরা সকল কটু কথা তারেকের প্রতি প্রয়োগ করলেও জিয়াউর রহমানের চরিত্র হননে এগোননি। কিন্তু শেখ হাসিনা করলেন বিপরীতটা। তিনি তারেকের প্রতি গালি উদগার না করে, জিয়াউর রহমানের প্রতি করলেন, যা তিনি আগেও করেছেন। সম্ভবত শেখ হাসিনার কোনো প্রটোকল অফিসার উপদেশ দিয়েছিলেন, নেত্রী, পোলাকে এটাক করাটা হয়ে যাবে আপনার লেভেলের নিচে। সুতরাং পোলাকে এটাক না করে পোলার বাপকে এটাক করুন।
কিন্তু এই প্রক্রিয়াতে শেখ হাসিনা এসে ঠেকেছেন, বয়সে এবং রাজনীতিতে তার চাইতে অনেক জুনিয়র, তারেকের লেভেলে। কারণ দুজনাই তাদের প্রয়াত পিতার সুনাম রক্ষার জন্য কথা বলছেন। তবে তারেক তার প্রতিপক্ষের পিতার দুর্নাম এবং নিজের পিতার সুনামগুলো সুনির্দিষ্টভাবে করেছেন - যেটা শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে পারেননি।
তিনি খুব দুর্বলভাবে নিজের পিতার হত্যাকান্ডে জিয়ার সম্পৃক্ততা দাড় করাতে চাইলেও তার পিতার কোনো সুনাম প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
রাউন্ড থৃ
ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের মতোই এই পলিটিকাল টুর্নামেন্টের লোকেশন এরপর বদলে যায়। ফ্রম লন্ডন টু কুয়ালা লামপুর। বৃহস্পতিবার ১২ জুন ২০১৪-তে কুয়ালা লামপুরে স্থানীয় বিএনপি শাখা আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তারেক তার টার্গেট বদলে ফেলেন। তারেক যখন লন্ডনে শেখ হাসিনার পিতাকে টার্গেট করেছিলেন তখন ঢাকায় শেখ হাসিনা টার্গেট করেন তারেকের পিতাকে। এবার কুয়ালা লামপুরে তারেক টার্গেট করেন শেখ হাসিনাকেই।
বাংলাভিশন টিভিতে আংশিকভাবে প্রচারিত খবরে দেখা যায়, তারেক বলেন (১) “তুমি দেশে ফেরার ১৭ দিন পরেই কেন জিয়া খুন হলেন? তুমি যদি কিছু না জানবে, তাহলে বোরকা পরে পালাচ্ছিলে কেন?” (২) “২০০৯-এ ক্ষমতায় আসার পরপরই বিডিআরের ৫৭ জন অফিসার নিহত হলো কেন? ডিফেন্স মিনিস্টার তো তখন হাসিনাই ছিল। এই হত্যাকান্ডের জন্য তার ৫৭ বার ফাসি হতে পারে। (৩) হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সংরক্ষিত সাতছড়ির গহিন বনে সাতটি বাংকার ও বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব। অতীতে চট্টগ্রামে অস্ত্র চোরাচালান ধরা পড়ার পর তদানীন্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও শিল্পমন্ত্রীকে যদি ফাসির দন্ড দেওয়া হতে পারে তাহলে বর্তমানে সাতছড়িতে যে অস্ত্র চোরাচালান ধরা পড়লো তার জন্যও শেখ হাসিনার ফাসির দন্ড হতে পারে।
লক্ষনীয় যে ইতিপূর্বে হাসিনা যেমন জিয়াকে সম্মানসূচক “আপনি” সম্বোধন করেননি, ঠিক তেমনি, কুয়ালা লামপুরে হাসিনাকে “আপনি” সম্বোধন করেননি তারেক। বলা যায়, অনাকাংক্ষিত অশালীনতার ক্ষেত্রে এখন দুজনাই সমান পর্যায়ে নেমে এসেছেন - তবে অগ্রনী ভ’মিকার জন্য ক্রেডিট দাবি করতে পারবেন হাসিনা।
রাউন্ড ফোর
এই রচনাটি লেখা হচ্ছে তারেক-হাসিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাউন্ড ফোর-এর প্রাক্কালে। লোকেশন ঢাকা। শনিবার ১৪ জুনে শেখ হাসিনা একটা প্রেস কনফারেন্সে বলবেন তার সদ্য সমাপ্ত চায়না টৃপ বিষয়ে। অনুমান করা যায় সেখানে হয়তো তিনি মুজিব-জিয়া বিতর্ক সম্পর্কে মন্তব্য করবেন। আর রবিবার ১৫ জুন ২০১৪-তে ইনজিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে তারেক রহমান সম্পাদিত “জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক” শীর্ষক বইটির প্রকাশনা উৎসব হবে। এই বইতে তারেক লিখেছেন, “লন্ডনে প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে আমি দালিলিক প্রমাণও উপস্থাপন করেছিলাম। আর এই সব দলিল প্রমাণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ইতহাস থেকে নেয়া। এখন আমি আরো একটি কথা বলতে চই। সেটি হলো শেখ মুজিব শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই অবৈধ নন; বরং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবেও ছিলেন অবৈধ। কারণ কোনো পাকিস্তানের নাগরিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আর তার ২৫ দিন পর তিনি গ্রহণ করলেন পাকিস্তানের পাসপোর্ট। এই বিষয়টি ইতিহাস বিচার করবে যুক্তি দিয়ে, আবেগ দিয়ে নয়। পাকিস্তানের পাসপোর্ট গ্রহণ করার পর আইনের দৃষ্টিতে এবং যুক্তিবুদ্ধির বিচারেও শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানের নাগরিক। অতএব, বাংলাদেশে ফিরে তার প্রথম এবং প্রধান কাজটি হওয়ার কথা ছিল আইনগতভাবে যথানিয়মে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা। শেখ মুজিব কি তা করেছিলেন? ইতিহাসে গোজামিলের কোনো সুযোগ নেই।”
এই প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথি বিএনপি নেতা মি. তরিকুল ইসলাম ও সভাপতি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ নিশ্চয়ই এই বির্তক আরো এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এই বইটির প্ল্যানিং, এডিটিং ও ডিজাইন হয়েছে লন্ডনে এবং সার্বিকভাবে বইটি উচু মানের হয়েছে। আশা করা যায় বিএনপি এই বইটির বহুল প্রচারে কাজ করবে।
কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং পুরো রাজনৈতিক মহলে সেই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকবে। তারেক রহমান এখন কেন শেখ মুজিবের কর্মকান্ডের মূল্যায়ন করছেন?
এই প্রশ্নটি নিশ্চয়ই শেখ হাসিনার মনেও আসছে।
যদি এই একটি প্রশ্ন শেখ হাসিনা তার মোবাইল ফোন করেন তারেক রহমানকে?
যদি তার উত্তরে তারেক রহমান মোবাইল ফোনে ১০ট প্রশ্ন করেন শেখ হাসিনাকে?
তখন কি কথা হবে?
রাউন্ড ফাইভ
যে একটি প্রশ্ন তারেক রহমানকে করতে পারেন শেখ হাসিনা:
১ আপনি এর আগে কখনোই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো কটু কথা বলেননি। এখন হঠাৎ কেন আপনি দেশে ও বিদেশে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর কথা বলছেন বঙ্গবন্ধুর নামে?
রাউন্ড সিক্স
যে ১০টি প্রশ্ন তারেক রহমান করতে পারেন শেখ হাসিনাকে:
১ একথা ঠিক যে আপনার প্রয়াত পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সমালোচনা ও নিন্দার বহু সঙ্গত ও যৌক্তিক কারন সত্ত্বেও কখনোই আমার প্রয়াত পিতা তার (মুজিবের) প্রতি কোনো দিনো কোনো অশ্রদ্ধা ও অসম্মান প্রকাশ করেন নি। তার (জিয়ার) রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী আমার মা হবার পর তিনিও কখনোই শেখ মুজিবের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অসম্মান প্রকাশ করেননি। এমনকি কোনো ব্যক্তিগত আলোচনাতেও তিনি (মা) তা করেন না। 
পিতা ও মাতার এই সভ্য ও শালীন চরিত্রকে আমি অনুসরণ করার চেষ্টা সবসময়ই করেছি। আমার মা ১৯৯১-এর পরে এবং আমি ২০০১-এর পরে টুংগিপাড়ায় গিয়ে তার (মুজিবের) সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি। কিন্তু আমাদের পরিবারের এই ভদ্রতা, সৌজন্যতা ও শালীনতা আপনি উপেক্ষা করেছেন। বরং ১৯৯৬-এ ক্ষমতাসীন হবার পরে মিথ্যা অজুহাতে জিয়ার সমাধিস্থলে যাবার বেইলি বৃজটি সরিয়ে ফেলেন। আমাদের পারিবারিক গুনাবলিকে আপনি আমাদের দাসত্ব, দুর্বলতা ও আনুগত্যের (মুজিবের প্রতি) চিহ্ন স্বরূপ ভেবেছেন। আপনি ভেবেছেন মুজিব হত্যায় সংশ্লিষ্ট থাকায় জিয়া তার অপরাধবোধ থেকে মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধাবনত থেকেছেন। আপনি বোধ হয় আমার এবং আমার সম্পর্কে সেই একই কথা ভেবেছেন। 
আসলে সত্যটি তা নয়। আমার পিতা ও মার পারিবারিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সচ্ছলতা আমাদের সভ্য রীতিনীতির দিকে রেখেছে। কিন্তু আপনার এবং আপনার দলের অবিরাম প্রচারের ফলে কিছু সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে। এমনকি বিএনপিরও কিছু নেতা-কর্মীও  বিভ্রান্ত হয়েছেন। তারা মনে করেছেন আমার পিতা-মাতা এবং আমারই মতো, শেখ মুজিবকে সব বিতর্কের ঊর্ধে রেখে রাজনীতি করতে হবে।
তাই অনেকে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করার সময়ে শেখ মুজিবের ব্যর্থতা উল্লেখ করেন না। তারা ভাবেন, এর ফলে তাদের প্রতি আপনার ব্যক্তিগত আক্রোশ হবে কম। ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হবে কম। ফলে তাদের হয়রানি হবে কম। এবং মুজিব প্রসঙ্গে আওয়ামী বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সঙ্গে বিনা বিতর্কে তারা একই কাতারে থাকতে পারবেন।
কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারেননি যে, যে মুহুর্তে শেখ মুজিবকে বিতর্কের ঊর্ধে নিয়ে তাকে একটি কল্পিত ও অসত্য অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করা হয় সেই মুহুর্তেই আওয়ামী বিরোধী রাজনীতিও অসম্ভব হয়। কারণ, শেখ মুজিব যদি বিতর্কের ঊর্ধে থাকেন, তাহলে, তার সম্পর্কে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। যেমন, ২৩ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি কি আলোচনা করেছিলেন ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর সঙ্গে? কেন তিনি তাজউদ্দীন আহমেদের উপদেশ অনুরোধ উপেক্ষা করে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি আর্মির কাছে আত্মসমর্পন করলেন? কেন ১৯৭৪-এ দুর্ভিক্ষ হলো? কেন তিনি এক দলীয় শাসন চালু করলেন? কেন তিনি একনায়কে রূপান্তরিত হলেন? এসব প্রশ্ন আলোচিত হলেই বোঝা যাবে শেখ মুজিব তার শেষ জীবনে কতোটা ব্যর্থ পলিটিশিয়ান হয়েছিলেন। তার ব্যর্থতার ফলে দেশে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল সেটা পূরণে ইতিহাস ঠেলে দিয়েছিল জিয়াকে। সময়ের চাহিদা জিয়া পূরণ করেছিলেন। তিনি সফল পলিটিশিয়ান এবং সফল প্রশাসক হয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের সমস্যাটা হয়েছে সেখানে। জিয়া যদি সফল ও ভালো হয় তাহলে মুজিবের ব্যর্থতা ও মন্দ দিকগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। সুতরাং সকল সত্য অস্বীকার করে মুজিবকে সফল ও ভালো রূপে চিত্রিত ও প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। পাশাপাশি জিয়াকে পাকিস্তানি গুপ্তচর ও মন্দ বলতে হবে। (যদিও মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে এবং তারপরেও শেখ মুজিব ছিলেন পাকিস্তানে।) সেক্ষেত্রে মুজিবকে অপসরনকারী সবাই, মুজিবের পরে জিয়া ও অন্য যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা সবাই (আওয়ামী লীগের বাদে) এবং মুজিবের দল আওয়ামী লীগ বিরোধী সবাইকে বাংলাদেশের শত্রু বলা যাবে এবং সকল বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করা ন্যায়সঙ্গত হবে।
আমি এই সত্যটা বুঝতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি দেশকে বাচানোর লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের এই মুজিব কার্ডটা চিরকালের জন্য সরিয়ে ফেলতে হবে। তাই শেখ মুজিব সম্পর্কে যা সত্য সেটাই বলতে হবে। সেটাই যথেষ্ট। শেখ মুজিবের ব্যর্থতা ও মন্দ কাজগুলো মানুষকে জানালে তারা বুঝতে পারবে আমার পিতা কতোটা সফল ও ভালো ছিলেন এবং তার মৃত্যুর পরে আমার মা-র নেতৃত্বে বিএনপি কতোটা ভালো কাজ করেছে।
আর এজন্যই বাধ্য হয়ে এখন আপনার পিতার কর্মকান্ডের মুল্যায়ন ও বিবরণ দেশবাসীর সামনে আমি তুলে ধরছি। আশা করি এতে আপনি মাইন্ড করবেন না। আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, আপনার পিতাকে প্রতিষ্ঠিত করার অধিকার যেমন আপনার আছে, তেমনই আমার পিতাকে প্রতিষ্ঠিত করার অধিকার আমারও আছে বিশেষত যখন আমার পিতা আপনাদের মিথ্যা প্রচারের শিকার হচ্ছেন। আপনি চরম দু:সাহস দেখিয়ে বলেছেন, আমার পিতা বেচে থাকলে তাকে আসামি করে বিচার করতেন। আমি কি একটু এগিয়ে গিয়ে বলতে পারি, আপনার পিতার মরণোত্তর বিচার আমি করব অন্তত একটি কারণে এবং সেটা হলো ১৯৭৪-এ দুর্ভিক্ষে এত মানুষের মৃত্যু হবার জন্য? আমার প্রথম প্রশ্ন এটি। আপনি এ বিষয়ে কি বলবেন?
২ আপনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত ইনডিয়াতে নতুন দিল্লিতে ছিলেন। আমার পিতা আপনাকে, আপনার স্বামী ও বোনকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তখন আপনি ফিরলেন কেন? আপনি তো বিদেশে থাকতেই পছন্দ করেন। আপনার পিতার মৃত্যুর সময়ে বিদেশে জার্মানিতে ছিলেন। আপনি প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে পাচ বছরের মধ্যে প্রায় এক বছর বিদেশে ছিলেন। এখন ড. দীপুমনির বদলে আপনি বিদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। আপনার ছেলে, মেয়ে, বোন, সবাই তো বিদেশে। কেন ১৯৮১ তে স্বদেশে ফিরেছিলেন এবং কেনই বা এখন স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকতে চলে যাচ্ছেন না?
৩ আপনি বলেছেন, “জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি আপনাকে ফোন করে ফাসি (কাদের মোল্লাকে) না দিতে বলেছিলেন। একই অনুরোধ জানিয়ে অনেকে ফোন করেছিলেন। দেশে এমন কোনো লোক আছে যে এ ফোন পাওয়ার পর এ সাহস দেখাতে পারে? আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই সাহস দেখাতে পেরেছি।” 
ওয়ান ইলেভেনে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের ক্যু-র পরে আপনার সাহস কোথায় ছিল? আমার মা যখন একটানা বন্দি জীবন যাপন করছিলেন তখন আপনি কেন মইন-ফখরুল সঙ্গে সমঝোতা করে দুই বার বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন? আপনার স্মরণশক্তি ভালো। তবুও আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি। আমার মা ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ জেলমুক্ত হবার প্রায় দুই মাস পরে ৬ নভেম্বর ২০০৮-এ আপনি আমেরিকার নিরাপদ জীবন থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। আসলে আপনার সাহস নেই। যা আছে তা হলো ইনডিয়ার আশীর্বাদ এবং সেটাকে আপনি সাহস ভেবে আত্মপ্রসাদে ভোগেন।
প্রসঙ্গত একটি প্রশ্ন করতে চাই। বান কি মুন ও জন কেরির ফোনের কথা জনসম্মুখে প্রকাশ করাটা কি কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহিভর্’ত হয়নি?
৪ সাহস প্রসঙ্গে আমি আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই। ৩০ মে ১৯৮১-তে আমার পিতার মৃত্যুর পরে আপনি বোরকা পরে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন কেন?
৫ আপনি প্রায়ই আমার মা এবং আমার ব্যক্তিগত জীবন প্রসঙ্গে গুজণের ভিত্তিতে কুরুচিপূর্ণ কটাক্ষ করেন কেন? আমরা তো সত্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন করতে পারি আপনার স্বামী আপনাকে ছেড়ে বঙ্গভবনে দীর্ঘ সময়ের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন কেন?
৬ সাভারে রানা প্লাজায় সরকারি হিসাবে প্রায় দেড় হাজার (বেসরকারি হিসাবে অনেক বেশি) গার্মেন্টস শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করতে আপনার ছয় দিন দেরি হয়েছিল কেন? পিতা ও নিজের পরিবারের কারো মৃত্যু ছাড়া অন্য কারো অকালমৃত্যু কি আপনাকে নাড়া দেয়? শাপলা চত্বরে মে ২০১৩-তে ধর্মভীরু মানুষগুলোর মৃুত্যর পর  আপনি তাদের নিয়ে বিদ্রƒপ করলেন কেন?
৭ দিল্লিতে ২০১০-এ সম্পাদিত চুক্তিটি কেন বাংলাদেশের সংসদে আলোচিত হয়নি?
৮ গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসকে কেন অশ্রাব্য ভাষায় আপনি সমালোচনা করেছিলেন? এটা কি সত্যি যে বিদেশে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল আপনি সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী যে দেশে থাকেন ড. ইউনূস।
৯ বিদেশিদের সম্মাননা জানানোর জন্য সোনার পদকে জালিয়াতি বিষয়ে আপনি বলেন, “স্বর্ণকার তো মায়ের গহনাও চুরি করে। আমরা তো সম্মাননা দিয়েছি। এখানে সোনার তো বড় বিষয় নয়। ... এই সম্মাননাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য কেউ এটি করেছে কিনা এটিও দেখতে হবে।” চোর, ডাকাত, জালিয়াতদের পাশে দাড়ানো আপনার স্বভাবসিদ্ধ কেন?
১০ বিদেশিদের সম্মাননা দিচ্ছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন কেন দেশি বিচারপতিদের অসম্মান করছেন? নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে আদালতের নির্দেশের প্রসঙ্গ টেনে আপনি বলেছেন, “জজ অর্ডার দিলেন। তদন্ত চলাকালে ওই বেঞ্চ তাদের গ্রেফতারের অর্ডার দিল। আমরা এক-পা এগোতে পারি না। কেউ কেউ দুই তিন পা এগিয়ে যান। এতে সমস্যা সৃষ্টি হয়। তারা যে অর্ডার দিলেন, নিশ্চয়ই তাদের কাছে তথ্য আছে। এখন তথ্য চাইলে জজদের কাছে যান। তারা তথ্য দিলে সহযোগিতা হবে। ... কি? কনটেম্পট করবে? আমি পরোয়া করি না। আমার কথা কঠোর হয়ে যাচ্ছে? বাস্তব কথা কঠোরই হয়।”
আমিও এখন আপনার ভাষাতেই বলে আজ বিদায় নিতে চাই, আমার কথা কঠোর হয়ে যাচ্ছে? বাস্তব কথা কঠোরই হয়। 
১৪ জুন ২০১৪ shafik rahman

প্রচ্ছদ বাংলাদেশ সংবাদ ৬৫ বছরে অন্য এক আ.লীগ

আজ ২৩ জুন। আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দলটি ৬৫ বছরের মাথায় এসে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে৷ অথচ এই আওয়ামী লীগই পাঁচ বছর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল৷
একই সঙ্গে পরিণত হয়েছে অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলে। ঐতিহ্যবাহী এই দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দলীয় কর্মসূচি আবর্তিত হচ্ছে মূলত প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। তিনি ৩৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী পদে রয়েছেন৷
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থক নেতা-কর্মীদের এক বৈঠকে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তখন দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হক হন সাধারণ সম্পাদক। যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক ও গণমানুষের দল হিসেবে বিস্তার ঘটে আওয়ামী লীগের। সত্তরের নির্বাচনে বাঙালি জাতি আওয়ামী লীগের পক্ষে নিরঙ্কুশ রায় দেয়। এই দলটির নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর বিপর্যয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ৷ ১৯৮১ সালের ১৭ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর প্রতিবার সম্মেলনেই তিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আসছেন।
১৯৮৭ সালে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রথম ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ৷ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় আসে দলটি। তখন দলটিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে সুশাসনের ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল৷
পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ের কথা বলে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে। জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা ছাড়াই গত ৫ জানুয়ারি কার্যত একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখে ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীসহ কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চা খুব একটা নেই। আত্মসমালোচনা বা সরকারের কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনার কথা কেউ ভাবতে পারেন না৷ দলীয় নেতাদের যে একটা অংশ বক্তৃতা-বিবৃতিতে সক্রিয়, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য দলীয় প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ। তাঁদের বক্তব্য মূলত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে।
আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত দুই মাসে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কার্যনির্বাহী সংসদের দুটি বৈঠক হয়েছে। একটি বৈঠকে দলের সাংসদদেরও ডাকা হয়। কিন্তু ওই সব বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়নি। এমনকি নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন, ফেনীতে উপজেলা চেয়ারম্যানকে পুড়িয়ে হত্যা ও লক্ষ্মীপুরে খুনোখুনির বিষয় আলোচনায় স্থান পায়নি। কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা জানান, নেতাদের প্রায় সবাই দলীয় প্রধানের মনোভাব বুঝে বক্তব্য দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন-অর-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, সেনাশাসন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও মৌলবাদী রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চাটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি। তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক চর্চা এখনো যা আছে, তা আওয়ামী লীগেই বিদ্যমান।
আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্দিষ্ট সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলন হলেও ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের চর্চা অনেক দিন ধরেই নেই৷ দলীয় সভানেত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে এক বছর আগে। তাতে দলীয় প্রধানকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।
এ ছাড়া সারা দেশে ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ১৩টির হালনাগাদ কমিটি আছে। বাকিগুলোর কমিটি আটকে আছে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে। নারায়ণগঞ্জের বিতর্কিত নেতা শামীম ওসমানের অবস্থান দলে কী হবে, সেটা নিয়ে আটকে আছে ওই জেলার কমিটি।
সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো সম্মেলনের মাধ্যমে পুনর্গঠনের কথা ছিল। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে দলের একটি সাংগঠনিক বৈঠকে রাজশাহী, খুলনা মহানগরসহ সাতটি জেলা কমিটির সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে মুিন্সগঞ্জের সম্মেলন হয়েছে গত শনিবার। তাতে পুরোনো নেতৃত্বই রয়ে গেছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম বলতে এখন দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ।
জানতে চাইলে প্রবীণ রাজনীতিক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, আওয়ামী লীগের মূল ভিত্তি হচ্ছে জনসম্পৃক্ততা ও গণমুখিতা। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি জনগণ ছাড়া আওয়ামী লীগেরও অস্তিত্ব বিলীন। তিনি আরও বলেন, এখন সময় হচ্ছে সংবিধান রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে সম্পৃক্ত করার।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সোমবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল সাতটায় ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হবে। সোয়া সাতটায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, পায়রা ও বেলুন ওড়ানো হবে। বেলা তিনটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত গণশোভাযাত্রা। ২৮ জুন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে নেতা, কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন৷   prothom alo

সোমবার, ১০ মার্চ, ২০১৪

এক পাগলা রাজা এবং ডাইনি মায়ের ইতিকথা!--গোলাম মাওলা রনি সাবেক সংসদ সদস্য

লোকজন এখনো ভেবে পায় নাÑ তাকে কী নামে ডাকবে! পাগল, শয়তান, জালিম, ডাকাত, অমানুষ, পশুÑ নাহ! কোনোটাই যেন তাকে মানায় না। এমনকি সমাজের সব গালি বা মন্দ বাক্য দিয়ে যদি তাকে সম্বোধন করা হয় তবুও যেন পূর্ণতা পায় না তার অপকর্মগুলো। ইতিহাসের এক মহাসন্ধিক্ষণে তিনি ছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রাজা। সবচেয়ে নামী রাজবংশের রক্তের ধারক, তবুও তিনি ঘৃণিত-জঘন্যভাবে ঘৃণিত হয়ে আসছেন যুগ থেকে যুগান্তরেÑ কাল থেকে কালান্তরেÑ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আজ অবধি। তার হাজারো কুকর্ম তাকে হাজারো উপাধিতে ভূষিত করেছে; কিন্তু সবচেয়ে সুন্দরতম উপাধি হলো পাগলা রাজা।
পাগলা রাজার মা যেন তার কুসন্তানের চেয়েও অনেক বেশি খারাপ। তাকেও লোকজন গালাগালি করে অশ্লীল ভাষায়Ñ চরিত্রহীনা, ডাইনি, কুত্তী, বেশ্যাÑ আরো কত কী! কিন্তু তার পরও মানুষের রাগ কমে না। আপনি যদি ভূমধ্যসাগরের দুই পাড়ের রাজ্যগুলোতে যান, তাহলে দেখতে পাবেন সেখানকার লোকেরা দুই হাজার বছর ধরে পাগলা রাজার মায়ের নাম ধরে গালিগালাজ করছে এবং অভিশাপ দিয়েছে। আপনি হয়তো বলবেন লোকজনের গালাগালিতে কী হয়? আমি বলবÑ হয়, অনেক কিছুই হয়! পাগলা রাজা ও তার মায়ের বংশের একজন লোকও পৃথিবীতে বেঁচে নেই, সম্পূর্ণভাবে নির্বংশ হয়েছে পাগলা রাজার গোষ্ঠী। অথচ পৃথিবীর তাবৎ রাজবংশের দুই-চারজন রক্তের ধারক সব সময় বেঁচে থাকে প্রাকৃতিক নিয়মেইÑ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।
এখন পাগলা রাজার যত্তসব নষ্টামী, ভ্রষ্টতা ও নিষ্ঠুরতার ইতিবৃত্ত বলব; কিন্তু তার আগে বলে নিই তার ডাইনি মায়ের কাহিনী। তিনি ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী, বুদ্ধিমতী ও প্রচ রকম উচ্চাভিলাষী। তার বিকৃত যৌনাচার ও সীমাহীন কামুকতার কাহিনী রাজ্যময় বিস্তৃত ছিলÑ লোকজন সেসব কাহিনী বলাবলি করত আর ভদ্রজনেরা কানে আঙুল দিত অশ্লীল শব্দরাশি থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য। চার চারটি বিয়ে এবং চারজন স্বামীকেই তিনি বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিলেন। সব শেষে তিনি লোভে পড়ে নিজের বয়োবৃদ্ধ চাচাকে বিয়ে করেছিলেন কেবল রাজ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কত নারী ও পুরুষকে যে তিনি খুন করেছিলেন, তা কেউ বলতে পারবেন না। হতে পারে কয়েক শ’ কিংবা কয়েক হাজার। তরুণ ও যুবকদের প্রতি তার ছিল ভারি ঝোঁক। ধরে ধরে পছন্দমতো যুবকদের নিয়ে আসতেন আপন প্রাসাদেÑ তার পর ইচ্ছেমতো কামনা চরিতার্থ করতেন। সেসব হতভাগ্য যাতে কারো কাছে রানীমাতার অভিসারের কথা বলে দিতে না পারে সে জন্য তাদের গুম করে ফেলা হতো; কিভাবে গুম করা হতো তা আজো রহস্যাবৃত।
আমি যার কথা বলছি তার নাম ছিল এগ্রোপিনা। ১৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর তিনি জন্মেছিলেন। আর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে অর্থাৎ ৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ মারা গিয়েছিলেন। মারা গিয়েছিলেন মানে মেরে ফেলা হয়েছিল। বহু চেষ্টা-তদবির করে তিনি তার বৃদ্ধ চাচা যিনি ছিলেন সম্রাট, তাকে বিয়ে করলেন। তার পর ছলে-বলে-কৌশলে সিংহাসনের সব উত্তরাধিকারীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলেন। বৃদ্ধ সম্রাট কোনো উপায় না দেখে এগ্রোপিনার পূর্বতম স্বামীর ঔরসজাত সন্তানকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন। এরপর শুরু হলো অন্য অধ্যায়Ñ এক রাতে দেখা গেল বৃদ্ধ সম্রাট মরে গেছেন আর পরদিন মহাসমারোহে পাগলা রাজা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন। এর কিছু দিন পর পাগলা রাজা নিজ হাতে তার মাকে হত্যা করে ফেললেনÑ সে এক লম্বা কাহিনী।
পাগলা রাজার মায়ের কাহিনী এবং নাম শোনার পরও হয়তো অনেকে রাজার নামটি ধরতে পারেননি। কিন্তু আমি নিশ্চিতÑ আমি যদি পাগলা রাজার নাম বলি তবে এক কথায় সবাই তাকে চিনতে পারবেন। দুনিয়াতে তার মতো কুকর্ম কেউ করেননি; এমনকি ফেরাউনও নয়। ফেরাউনের বড় দোষÑ সে নিজেকে খোদা দাবি করেছিল। পাগলা রাজাও নিজেকে খোদা দাবি করেছিলেন। পার্থক্য হলো কথিত ফেরাউন দ্বিতীয় রামেসিস আদতে ছিলেন একজন মহাবীর, মহাজ্ঞানী এবং যুদ্ধজয়ী সুশাসক; মিসরবাসী এখনো তাকে মহান রামিসিস বা রামেসিস দ্য গ্রেট বলে ডাকেন। অন্য দিকে পাগলা রাজার অত্যাচারে রাজ্যময় লোক অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তার জুলুম আর পাগলামিতে আল্লাহর জমিনের মাশরেক থেকে মাগরিব পর্যন্ত তাবৎ ভূখণ্ডের অধিবাসী অভিশাপ বর্ষণ করতে থাকে। ফলে আসমান থেকে নেমে আসে একের পর এক বিপর্যয়। পাগলা রাজার স্বপ্নের প্রাসাদ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়Ñ আল্লাহর গজবে তিনি মৃত্যুবরণ করার জন্য চিৎকার করতে থাকেন। পাত্র-মিত্র, চাকর-বাকর সবার হাত-পা ধরতে থাকেন এবং সবাইকে তলোয়ার দিয়ে তাকে হত্যা করার জন্য আকুতি জানাতে থাকেন। কেউ যখন তার অনুরোধে সাড়া দিলেন না, তখনই তিনি পৃথিবীর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেনÑ তবে কি আমার কোনো বন্ধু নেই যে আমার অনুরোধে আমাকে জীবন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আমাকে মেরে ফেলতে পারে; কিংবা আমার কি তাহলে কোনো শত্রুও নেই যে কিনা বিুব্ধ হয়ে আমাকে মেরে ফেলতে পারে?
এবার আমি পাগলা রাজার নামটি বলে মূল কাহিনীটি শুরু করি। তার নাম নিরো। পুরো নাম নিরো কডিয়াস সিজার। ‘রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’Ñ ঐতিহাসিক সেই উপকথাটির নায়ক তিনি। রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন ১৩ অক্টোবর ৫৪ খ্রিষ্টাব্দেÑ যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। রাজত্ব করেছিলেন মোট ১৪ বছর। ৩০ বছর বয়সে অর্থাৎ ৬৮ সালের ৯ জুন রাতে নিজ হাতে নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করার মাধ্যমে এক দিকে যেমন নিজের জীবনের সমাপ্তি ঘটান, অন্য দিকে মহান পূর্বপুরুষ জুলিয়ার্স সিজার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ এবং কডিয়াস সিজার অগাস্টাস সাম্রাজ্যের প্রায় এক শ’ বছরের পুরনো শাসনামলেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। তার কুকর্মের অভিশাপে দুনিয়ার কোথাও মহান জুলিয়ার্স সিজারের রক্তের কোনো ধারক খুঁজে পাওয়া যাবে নাÑ এ যেন প্রকৃতির এক দুরন্ত প্রতিশোধ, যা শিক্ষণীয় হয়ে থাকে যুগ-যুগান্তরের অত্যাচারী শাসকদের জন্যÑ যদি তারা আসলেই কিছু শিখতে চায়।
নিরোর চরিত্রের বদ জিনিসগুলো মূলত তার মায়ের চরিত্র থেকে সংক্রমিত হতে থাকে। শিশু নিরো দেখত তার মা দিবানিশি তার বাবাকে অত্যাচার করছে। প্রাসাদের মধ্যেই একের পর এক অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। বিশেষ করে মায়ের যৌনাচারের বিকৃত অভিব্যক্তি নিরোকে শৈশবকাল থেকে নিজ জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। তার শরীরে যৌবনের ছোঁয়া লাগামাত্রই সে নিজেকে নিয়ে মেতে ওঠে ভ্রষ্টাচারে। রক্ত সম্পর্কে তার দাদা ও মায়ের বিয়ের কারণে হঠাৎ দাদা থেকে বাবা হয়ে যাওয়া সম্রাট কডিয়াসও ছিলেন বিকৃত রুচির মানুষ। ফলে নিরোর পক্ষে কোনো অপকর্ম করতে নীতিনৈতিকতার কোনো বাধা ছিল না প্রাসাদের ভেতরে কিংবা বাইরে।
কিশোর নিরো সাঙ্গপাঙ্গসহ রোম নগরীতে ঘুরে বেড়াত এবং ইচ্ছেমতো যার-তার ঘরে ঢুকে পড়ত। পছন্দমতো কোনো মেয়ে পেলে তো কথাই নেই। নিজের ভ্রষ্টতার স্বাক্ষর রেখে আসত সেসব পরিবারের চাপা কান্নার উপযুক্ত জবাব হিসেবে। সারা রোমে তার বিরুদ্ধে ছিঃ ছিঃ রব উঠল। তার মা এগ্রোপিনা ছেলের কুকর্ম কমানোর জন্য অল্প বয়সে তার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হলো। তার কামনা বাসনা দিনকে দিন বাড়তে থাকল। প্রথম স্ত্রী কডিয়া অক্টাভিয়া ছিলেন সম্রাট কডিয়াসের মেয়ে রীতিমতো রোমান রাজরক্তের ধারক। সম্পর্কে নিরোর সৎ বোন; কিন্তু দুশ্চরিত্র নিরো প্রথমে এক ক্রীতদাসীর প্রেমে পড়েন, যার নাম কডিয়া এসিটি। তার পর পপ্পিয়া সাবিনা নামের এক বিবাহিত মহিলার প্রেমে পড়েন এবং একসময় তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়েও করেন। শুধু কি তাই, মেসালিনা ও স্পারস নামের অন্য দুই মহিলাকেও বিয়ে করেন। ফলে অতি অল্প বয়সেই তার বউয়ের সংখ্যা দাঁড়াল চার-এ। তবে অবাক করা বিষয় হলো তার চার নম্বর বউ স্পারস কিন্তু মেয়ে ছিলেন না। তিনি ছিলেন অনিন্দ্য সুন্দর এক বালক ক্রীতদাস। ৬৭ খ্রি. সম্রাট নিরো তাকে বিয়ে করেন সমকামিতার জন্য।
৫৪ খ্রিষ্টাব্দে নিরো সুবিশাল রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হন। আজকের দুনিয়ার বলতে গেলে সমগ্র ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ নিয়ে তার সুবিশাল সাম্রাজ্য ছিল বলে ধনে-জ্ঞানে এবং খ্যাতিতে ছিলেন দুনিয়ার শীর্ষস্থানে। এই রাজ্য পরিচালনার জন্য পাত্র-মিত্র, উজির, নাজির ও সেনাপতি ছাড়াও ছিল শক্তিশালী সিনেট বা সংসদ। নিরোর বয়স যদিও মাত্র ১৭ বছর ছিল তথাপি তিনি ছিলেন অনেক দিক থেকেই দক্ষ এবং অতিমাত্রায় আত্মমর্যাদাশীল। সিনেটের একজন প্রভাবশালী সদস্য ছাড়াও তার দু’জন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা ছিলেন লুসিয়াস ও বুররাস নামে। অন্য দিকে তার মা এগ্রোপিনার প্রভাব তো ছিলই।
সম্রাট নিরো কারো পরামর্শ বা কর্তৃত্ব মেনে নিতে নারাজ। বিশেষ করে তার মায়ের সাথে সম্পর্কের চরম অবনতি হলো। তার মা যখন ছেলের দাম্পত্য জীবনে নাক গলাতে আরম্ভ করলেন, তখনই পরিস্থিতি চলে গেল আয়ত্তের বাইরে। নিরোর প্রথম স্ত্রী অক্টাভিয়া ছিলেন রাজকুমারী। ফলে তিনি নতুন সম্রাটের ভ্রষ্টতা মেনে নিতে পারেননি। সম্রাট তাকে রাজ্য থেকে বের করে একটি নির্জন দ্বীপে নির্বাসনে পাঠান। এ নিয়ে রাজ পরিবার ও অভিজাত মহলে দারুণ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সম্রাট কয়েকজন অভিজাত নাগরিককে হত্যা করেন এবং একসময় নিজের মাকেও মেরে ফেলেন।
ক্ষমতা লাভের পাঁচ বছরের মাথায় সম্রাট নিরো অনেকটা অর্ধ উন্মাদের মতো হয়ে যান। বিরোধী মতামত একদম সহ্য করতে পারতেন না। যাকে ইচ্ছে তাকে শাস্তি দিতেন আবার যাকে ইচ্ছে তাকে মেরেও ফেলতেন। সাম্রাজ্যের অভিজাতবর্গকে রাতের আঁধারে ধরে এনে গুম করে ফেলতেন। হঠাৎ করেই তিনি আবিষ্কার করলেন সিনেটে সম্ভবত তাকে নিয়ে চক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বিরোধীদলীয় সিনেটেরদের ধরে আনলেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রায় এক শ’ প্রভাবশালী, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং রোমান সাম্রাজ্যের কীর্তিমান রাজনীতিবিদদের হত্যা করলেন। এরপর সাম্রাজ্য বিরোধীমুক্ত হয়েছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে লাগলেন।
৬০ সালের পর সম্রাটের বোধ হয় মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটল। তিনি রাত-বিরাত ঘর থেকে বের হন। প্রকাশ্য রাজপথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা, গান করা কিংবা চিৎকার করে ভিক্ষা করার মতো নি¤œমানের কাজকর্ম করতে থাকেন। এ সময় তিনি নিজেকে খোদা বলে দাবি করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি বলতে থাকেনÑ ‘এই পৃথিবীতে খোদা বলে যদি কেউ থেকে থাকে তবে সেই খোদার দরকার আছে তার সাহায্য গ্রহণের; কিন্তু তার কোনো দরকার নেই কোনো খোদার সাহায্য।’ তিনি রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যেতেন, তার পর কোনো পথচারীকে ধরে বলতেনÑ এই তুমি গান করছ কেন? আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে গান গাওয়া হচ্ছে? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা! Ñ এ কথা বলেই তিনি তার সাথে থাকা প্রহরীদের নির্দেশ দিতেন ওই পথচারীর শিরñেদ করার জন্য। পথচারীর মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যখন রাজপথের ধুলায় লুটিয়ে পড়ত, তখন সম্রাট নিরো অদ্ভূত এক পৈশাচিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন।
তিনি রাজপ্রাসাদে প্রায়ই শাহী ভোজে রোমের অভিজাতবর্গকে পিঠে-পায়েসসহ নানা রকম রাজভোগ খাওয়ানোর জন্য দাওয়াত করতেন। লোকজন এলে তিনি নিজে গান গাইতেন ও নাচতেন। রাজ্যের সম্মানিত বয়স্ক লোকদেরও গান গাইতে এবং নাচতে নির্দেশ দিতেন। তারা যখন সম্রাটের হুকুম পালন করতেন তখন তিনি বুড়োদের বেসুরো গান এবং ধ্যাতাং ধ্যাতাং নাচ দেখে খিলখিলিয়ে ও পিকপিকিয়ে হাসতেন। এর ক’দিন পর তিনি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে টাইবার নদীর তীরবর্তী একটি রাজকীয় ফলের বাগানে গিয়ে উঠলেন। সেখানে তাঁবু টানিয়ে তিনি প্রিয় স্ত্রী সাবিনাকে নিয়ে থাকতেন। সাবিনার প্রতি নির্দেশ ছিল সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে পালঙ্কের ওপর শুয়ে থাকা। সম্রাট উলঙ্গ স্ত্রীর শরীরের ওপর হালকা একটি চাদর দিয়ে আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতেন। চাদরটি ছিল অতিশয় পাতলা ও মসৃণ, যার ফাঁক দিয়ে সম্রাজ্ঞীর শরীর দেখা যেত। এরপর তিনি সেই তাঁবুর মধ্যে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ডাকতেন। কেউ যদি ভুলক্রমে সম্রাজ্ঞীর উলঙ্গ শরীরের দিকে তাকাতেন তাহলে আর রক্ষা ছিল নাÑ নির্ঘাত মরতে হতো।
এভাবেই সম্রাট নিরোর পাগলামি চলছিল। সম্রাটের পাগলামির শিকার হয়ে পুরো রোমবাসী পাগল হওয়ার উপক্রম হলেন। তার ক্ষমতা লাভের ১০ বছরের মাথায় তিনি ঘটিয়ে ফেললেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দানবীয় ঘটনা। ’৬৪ সালের ১৮ জুলাই তিনি রোম নগরীতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। নগরীর সবচেয়ে বড় বিপণিবিতান সার্কাস মাক্সিমাসে আগুনের সূত্রপাত হলো। ১৯ জুলাই রাত পর্যন্ত মোট ৪৮ ঘণ্টা ধরে রোম নগরী পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। কেউ বলে তিনি বাঁশি বাজাচ্ছিলেন আবার কেউ বলে ভায়োলিন।
রোম নগরীর সেই আগুন নিয়ে বহু কথাÑ বহু উপকথা প্রচলিত। কেউ বলেন, রোমের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লোকজন যখন রোমিউলাসের নাম উচ্চারণ করতেন তখন সম্রাট নিরোর শরীরে হিংসের আগুন জ্বলে উঠত। তিনি চাইতেন নতুন একটি শহর নির্মাণ করে ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে। আবার অন্যরা বলেন, রোম নগরীর পুরনো বাড়িঘর ও অলিগলি তার একদম পছন্দ হতো না। তাই তো তিনি পুরনো নগরী জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে নতুন একটি শহর গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন নিজের নাম ও যশকে কৃতীময় করার জন্য।
আগুনে ভস্মীভূত হওয়ার দু-এক মাসের মধ্যেই নিরো নতুন নগরী নির্মাণের কাজে হাত দিলেন। প্রায় ১০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে তৈরি হতে থাকল নতুন ও অত্যাধুনিক শহর। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে রাতারাতি সংগ্রহ করা হতো কোটি কোটি টন মার্বেল, গ্রানাইডসহ অন্যান্য মূল্যবান পাথর। জড়ো করা হলো লাখ লাখ ক্রীতদাসকে। চলতে থাকল নতুন শহর নির্মাণের কাজ। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ চলেÑ আর পাগলা সম্রাট একটি ঘোড়ায় চড়ে সেই দৃশ্য দেখেন এবং ভায়োলিন বাজিয়ে গান করেন। এ কাজ করতে করতে তার রাজকোষের সব অর্থভাণ্ডার শেষ হলে গেল। সেনাবাহিনীর বেতনভাতা আটকা পড়ার উপক্রম হলো; কিন্তু তখনো বাকি ছিল সম্রাটের দৃষ্টিতে নতুন দু’টি স্থাপনার নির্মাণ। একটি হলো নিজের জন্য বিলাসবহুল প্রাসাদ আর অন্যটি হলো ৩০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট তার নিজের একটি ভাস্কর্য।
সম্রাটের অর্থমন্ত্রী অনেক বোঝালেন অর্থসঙ্কটের কথা; কিন্তু পাগলা সম্রাটের জিদÑ না, করতেই হবে ৩০০ একর জায়গার ওপর ‘ডোমাস আউরিয়া’ নামের প্রাসাদ এবং ৩০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যয় ধরা হলো ৩০০ কোটি স্বর্ণমুদ্রা। টাকা কোথায়? পাগলা রাজা হুকুম দিলেন ট্যাক্স বাড়াও এবং রাজ্যের ধনীদের ধন লুট করো। হুকুম তামিল হলো এবং এক দিনের মধ্যে অর্থ সংগ্রহ হয়ে গেল; কিন্তু রাজ্যে দেখা দিলো ভয়াবহ অরাজকতা ও বিদ্রোহ। সম্রাট কঠোরহস্তে বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করলেন। ফলে রোম বিদ্রোহমুক্ত হলো বটে; কিন্তু প্রদেশগুলোতে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। এভাবে চলল ৬৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ইতোমধ্যে সম্রাটের শহর, প্রাসাদ ও ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শেষ হলো। সম্রাট ৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মহা ধুমধামে নতুন প্রাসাদে উঠলেন।
মার্চ মাসে গাল্লিয়া প্রদেশের গভর্নর গাইয়াস জুনিয়াস সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন অতিরিক্ত কর আরোপের অভিযোগ তুলে। সম্রাট স্বয়ং যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হলেন। পরিস্থিতি তার প্রতিকূলে চলে যাওয়ায় তিনি রোমে পালিয়ে এলেন। তিনি দুপুরের দিকে তার প্রাসাদে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লেন। মাঝ রাতে জেগে দেখেন প্রাসাদের সব রক্ষী পালিয়ে চলে গেছে। এরপর তিনি প্রাসাদের বিভিন্ন কক্ষে অবস্থানরত তার বন্ধু-বান্ধবদের খোঁজ করলেন। দেখলেন কেউ নেইÑ সবাই তাকে ছেড়ে পালিয়েছে। এরপর তিনি চিৎকার করে বললেনÑ কেউ কি আছো যে আমাকে তার তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারে। প্রাসাদ বেদিতে তার আর্তচিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো; কিন্তু কেউ এলো না।
সম্রাট পাগলের মতো প্রাসাদ থেকে দৌড়ে বের হয়ে এলেন গভীর রাতে। তারই প্রতিষ্ঠিত শহরের অলিগলিতে চিৎকার করলেন। কেউ তার জন্য দরজা খুলল না। ইতোমধ্যে তার চারজন বিশ্বস্ত চাকর ও বালক স্ত্রী স্পারস এগিয়ে এলেন। সম্রাট তাদের কবর খোঁড়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। এমন সময় সম্রাটের কাছে খবর এলোÑ রোমান সিনেট তাকে গণশত্রু আখ্যা দিয়ে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে। এ খবর শুনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। নিজের চাকু দিয়ে নিজের গলার রগ কেটে আত্মহত্যা করলেন। মৃত্যুর সময় উচ্চারণ করলেন সেই বিখ্যাত বাণীÑ ‘কুয়ালিস আর্টিফেক্স পিরিও’। ইংরেজিতে যার অর্থ দাঁড়ায়Ñ "What an artist dies in me."  তারিখটি আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিÑ ৬৮ সালের ৯ জুন, সময় ভোররাত। স্থান : রাজপথ।